ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকেই রাজনৈতিক সহিংসতাসহ সামগ্রিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সময় যত গড়িয়েছে, খুনাখুনি, মব সৃষ্টি, গুলি, ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি ও অপহরণের মতো ঘটনা ততই আলোচনায় এসেছে। সামাজিক মাধ্যমে চাঁদাবাজদের অস্ত্রের মহড়ার ভিডিও ভাইরাল হচ্ছে নিয়মিত। নরসিংদীতে ধর্ষণের বিচার চাওয়ায় এক কিশোরীকে অপহরণ করে হত্যার ঘটনাসহ নানা ঘটনা জনমনে গভীর প্রভাব ফেলেছে।
আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও হামলার শিকার হচ্ছেন। ভোক্তা অধিকারের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট অভিযানে গিয়ে বাধার মুখে পড়েছেন। বিভিন্ন ঘটনায় থানা ঘেরাও করে দাবি আদায়ের প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে আইন-শৃঙ্খলার উন্নয়নে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে সরকার। পুলিশের শীর্ষ পদগুলোতে রদবদল শুরু হয়েছে। নবনিযুক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক মো. আলী হোসেন ফকির দায়িত্ব নেওয়ার পর মাদক, মব সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের নির্দেশ দিয়েছেন। তার নির্দেশনায় বড় ধরনের অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে পুলিশ।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে দক্ষ ও যোগ্য কর্মকর্তাদের যথাযথ পদায়ন না করলে পরিস্থিতির উন্নতি কঠিন হবে। রাজনৈতিক সহিংসতা ও চাঁদাবাজি দমনে পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করা জরুরি।
সাম্প্রতিক কয়েক দিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে একাধিক সহিংস ঘটনা ঘটেছে। চট্টগ্রামের রাউজানে এক বিএনপি নেতাকে গুলি করে হত্যা, নেত্রকোনার কলমাকান্দায় অভিযানে গিয়ে ডিবি পুলিশের ওপর হামলা, রাজধানীর পান্থপথে গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা, ফটিকছড়িতে ট্রাফিক সার্জেন্টকে মারধর, রায়েরবাজারে স্কুলছাত্রী হত্যাসহ একাধিক ঘটনায় জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। নড়াইল, নোয়াখালী ও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকাতেও সংঘর্ষ ও হামলার খবর পাওয়া গেছে।
রাজধানীর হাতিরঝিলে এক শিশুর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় থানা ঘেরাও ও সড়ক অবরোধের ঘটনাও ঘটে। পুলিশের পক্ষ থেকে প্রাথমিকভাবে পানিতে ডুবে মৃত্যুর ধারণা দেওয়া হলেও তদন্তের আশ্বাসের পরও জনতার চাপে হত্যা মামলা নিতে হয়।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. ওমর ফারুক বলেন, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে নতুন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। জামিনে বের হওয়া অপরাধী, মাদক নিয়ন্ত্রণ, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন এবং সম্ভাব্য জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। তিনি বলেন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে দক্ষতার ভিত্তিতে পদায়ন নিশ্চিত করতে হবে এবং প্রশিক্ষণ জোরদার করতে হবে।
পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, মব কালচারসহ কিছু পুরোনো সমস্যা রয়েছে। তবে নতুন আইজিপির নির্দেশনা অনুযায়ী মাদক, মব ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে দ্রুত অভিযান শুরু হবে। রমজানে যানজট নিরসনেও বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নবনিযুক্ত আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির জানিয়েছেন, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে কিছু কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে। চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাস দমনে এলাকাভিত্তিক কমিটি গঠন এবং মাদকবিরোধী অভিযান আরও জোরদার করা হবে।
