আজ ৮ মার্চ, আন্তর্জাতিক নারী দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিনটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হচ্ছে। নারী দিবস কেবল উদযাপনের দিন নয়, বরং নারীর অধিকার, সমতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় আত্মসমালোচনা ও নতুন অঙ্গীকারেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়।
২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রতিপাদ্য হলো— ‘অধিকার, ন্যায়বিচার, উদ্যোগ—সব নারীর জন্য হোক।’ এই প্রতিপাদ্য আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, বিশ্বজুড়ে নারীর উন্নয়ন ঘটলেও এখনও অনেক নারী তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। তাই নারীর প্রতি শুধু প্রতীকী সম্মান নয়, বাস্তব জীবনে সমতা ও সুযোগ নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি।
নানা কর্মসূচিতে পালিত হচ্ছে নারী দিবস আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন এনজিও ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান আলোচনা সভা, শোভাযাত্রা ও সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে।
দিবসটি উপলক্ষে ‘অদম্য নারী পুরস্কার’ প্রদান করা হবে। পাশাপাশি গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রায় বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে ‘গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রায় শ্রেষ্ঠ অদম্য নারী’ সম্মাননা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বাণী আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৃথক বাণী দিয়েছেন। বাণীতে তারা বিশ্বের সব নারীকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন।
তারা বলেন, নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা, বৈষম্য দূরীকরণ এবং নারীর ক্ষমতায়নে সমাজের সব স্তরের মানুষকে একযোগে কাজ করতে হবে।
আন্তর্জাতিক নারী দিবসের ইতিহাস আন্তর্জাতিক নারী দিবসের ইতিহাস শত বছরেরও বেশি পুরোনো। ১৯০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রে নারী শ্রমিকরা কর্মঘণ্টা কমানো, ন্যায্য মজুরি এবং ভোটাধিকারের দাবিতে আন্দোলনে নামেন। পরবর্তীতে ১৯১০ সালে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক নারী সম্মেলনে আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালনের প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। ১৯১১ সালে প্রথমবারের মতো কয়েকটি দেশে এই দিবসটি উদযাপিত হয়।
কেন গুরুত্বপূর্ণ ‘অধিকার, ন্যায়বিচার ও উদ্যোগ’ এবারের প্রতিপাদ্যে তিনটি শব্দ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ— অধিকার, ন্যায়বিচার এবং উদ্যোগ। অধিকার বলতে শুধু আইনি স্বীকৃতি নয়, বাস্তবে সেই অধিকার ভোগ করার সুযোগকেও বোঝায়। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত না হলে নারীর উন্নয়ন অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
ন্যায়বিচার মানে বৈষম্য ও সহিংসতার বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিকার নিশ্চিত করা। গার্হস্থ্য সহিংসতা, যৌন হয়রানি ও বাল্যবিবাহের মতো সমস্যাগুলো এখনো বিশ্বের অনেক দেশে বড় সামাজিক চ্যালেঞ্জ।
আর উদ্যোগ বলতে বোঝায় নারীর ক্ষমতায়নের জন্য বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করা—যেমন প্রশিক্ষণ, অর্থনৈতিক সহায়তা, প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার এবং নেতৃত্বের সুযোগ সৃষ্টি করা। বাংলাদেশে নারী উন্নয়ন ও চ্যালেঞ্জ বাংলাদেশে নারীরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। বিশেষ করে তৈরি পোশাকশিল্পে লাখো নারী দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিচ্ছেন। শিক্ষা ক্ষেত্রেও মেয়েদের অগ্রগতি উল্লেখযোগ্য।
এছাড়া ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মসূচিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে। তবে এখনও বাল্যবিবাহ, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতা এবং সামাজিক কুসংস্কার নারীর অগ্রগতির পথে বড় বাধা হয়ে রয়েছে।
নারী উন্নয়ন মানেই সমাজের উন্নয়ন নারী দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, নারীর অগ্রগতি মানে শুধু নারীর উন্নয়ন নয়, বরং পুরো সমাজের অগ্রগতি। পরিবারে সমান দায়িত্ব বণ্টন, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যহীন পরিবেশ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হলে উন্নয়ন আরও গতিশীল হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ছেলে ও মেয়েকে সমানভাবে বড় করে তোলা এবং তাদের স্বপ্ন দেখতে শেখানোর মাধ্যমেই প্রকৃত সামাজিক পরিবর্তনের সূচনা সম্ভব।
উল্লেখ্য, ১৯৭৫ সালে জাতিসংঘ আনুষ্ঠানিকভাবে ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এরপর থেকে বিশ্বের প্রায় সব দেশেই দিবসটি যথাযথ মর্যাদায় পালিত হয়ে আসছে।
