দেশের বিভিন্ন স্থানে মব স'ন্ত্রা'স বেড়েই চলেছে, নিরপরাধ মানুষও ঝুঁকিতে

দেশের বিভিন্ন স্থানে মব স’ন্ত্রা’স বেড়েই চলেছে, নিরপরাধ মানুষও ঝুঁকিতে

জাতীয়

‘আমার পোলাতো চোর আছিল না, রাস্তা থাইক্যা ধইরা ওরা পোলাডারে পিডাইয়া মারছে। আমি এর বিচার চাই।’ এভাবেই বলছিলেন সন্তান হারিয়ে অসহায় নারী দিলরুবা আক্তার। তিনি গত ৩১ অক্টোবর রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানার সদরঘাট এলাকায় মব সন্ত্রাসের শিকার হয়ে নিহত বিআইডব্লিউটির ইলেকট্রিশিয়ান আনোয়ার হোসেন বাবুর মা।

তিনি হাউমাউ করে কাঁদছিলেন আর বলছিলেন, ‘আমার নিরপরাধ পোলারে যারা পিটিয়ে মারছে তাদের বিচার চাই।’ প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ জানতে পেরেছে আনোয়ার হোসেন চোর ছিলেন না। এ ঘটনায় মামলা হলেও বেশির ভাগ অপরাধী এখনো গ্রেপ্তার হয়নি। পুরান ঢাকার রায়সাহেব বাজার স্টার হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে মবের শিকার হয়েছেন এক ক্রেতা।

রেস্টুরেন্টের স্টাফরা ওই ক্রেতাকে ঘিরে ধরে টানাহেঁচড়া ও মারধর করতে থাকেন। আশপাশে থাকা অন্যরা পরিস্থিতি থামানোর চেষ্টা করলেও সেখানে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। গত শনিবার এ ঘটনার একটি ভিডিও ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এ তো মাত্র দুটি ঘটনা।

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এখনো ঘটেই চলছে মবের ঘটনা। মব সন্ত্রাস থেকে রেহাই পাচ্ছেন না সাধারণ মানুষ। বর্তমান সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দায়িত্ব নেওয়ার পর মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করলেও দুর্বৃত্তরা নানা কায়দায় নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিল করে যাচ্ছে। অন্যদিকে, অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে দেশে মব সন্ত্রাসে নিহত ৩০৮ জন। যার বেশির ভাগ ঘটনায় তদন্তে অগ্রগতি নেই।

এমনকি হামলা, হত্যা, আগুনের ঘটনায় জড়িতদের বেশির ভাগ এখনো গ্রেপ্তার হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।
অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হলেই আইন হাতে তুলে নেওয়ার ঘটনা (গণপিটুনি) বেড়ে যায়। গণপিটুনি আইন ও সামাজিক রীতি বহির্ভূত এক ধরনের নির্যাতন ও সহিংসতা। এ ছাড়া ব্যক্তিগত শত্রুতা ও উদ্দেশ্যেপ্রণোদিত হয়ে প্রতিপক্ষকে পিটিয়ে আহত করা কিংবা হত্যা করার মতো সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করে। তবে নতুন সরকার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর অবস্থানে নিয়ে মবের মতো ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করে জনমনে স্বস্তি দেবে বলে আমরা আশাবাদী।

মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘মব ভায়োলেন্স’ বা উচ্ছৃঙ্খল জনতার সহিংসতার পরিমাণ গত ৫ আগস্টের পর দেশে বেড়ে যায়। সে সময়ের সরকার তা বন্ধ করতে তেমন পদক্ষেপ নেয়নি। কখনো কখনো কাউকে জোর করে কোনো পদ থেকে নামিয়ে দেওয়াসহ নানাভাবে ‘মবের’ সাহায্য নেওয়া হয়েছে। এ কারণেই বেড়েছে এসব মব কেন্দ্রিক সহিংসতা। তবে বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ২১ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসন থেকে নবনির্বাচিত স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা মবের শিকার হয়েছেন। এ ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থাও নেওয়া হয়নি বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তারা। তবে গত ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পর নতুন সরকার দায়িত্ব পেয়ে প্রশাসনের সক্রিয়তা বাড়ানো হচ্ছে বলে জানিয়ে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র। দায়িত্ব নেওয়ার পর শিগগির সরকারের পক্ষ থেকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়।

খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, মব কালচারের দিন শেষ। র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল ইফতেখার আহমেদ বলেন, র‌্যাবের প্রতিটি সদস্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে তাদের সর্বোচ্চটা দিয়ে দিচ্ছে। মব সন্ত্রাস যেই ঘটনানোর চেষ্টা করবে র‌্যাব তাকে আইনের আওতায় নিয়ে আসবে। অপরাধীকে আমরা অপরাধী হিসেবেই দেখি।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র-আসকের জরিপ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের হিসাবে দেখা যায়, ২০২৪ সালে মব সন্ত্রাসের ঘটনায় ১২৮ জনের মৃত্যু হয়, এর মধ্যে আগস্ট থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে ৫ মাসে ৯৬ জনের মৃত্যু হয়। এ ছাড়া ২০২৫ সালে ১৯৮ জনের মৃত্যু হয় এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে ১৪ জনের মৃত্যু হয়। এ ছাড়া সংখ্যালঘুদের ওপর ২১১টি মব সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় ৪৮৭টি বাসা-বাড়িতে হামলা চালানো হয়, আগুন দেওয়া হয় ৮৮টি বাড়িতে। এ ছাড়া সংখ্যালঘুদের ১১৩টি ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানে হামলা চালানো হয়। একই সঙ্গে ৪৭টি মন্দির-মঠ ও ১৯৪টি প্রতিমা ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এসব সার্বিক ঘটনায় ৭৮ জন আহত ও পাঁচজন নিহত হন। ওই সময়ে সারা দেশে পুলিশ সদস্যদের লক্ষ্য করে মব সন্ত্রাস চালানো হয়। এতে পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা যেমন হতাহত হন, তেমনি অনেকের মধ্যে দেখা দেয় আতঙ্ক ও মানসিক চাপ।

পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র বলছে, পুলিশের ওপর মব সন্ত্রাস, হামলা, হেনস্তার ঘটনায় অনেক মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ৭০টি ছিল বড় ধরনের হামলার ঘটনা। এর মধ্যে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ২৪টি, অক্টোবরে ৩৪টি, নভেম্বরে ৪৯টি, ডিসেম্বরে ৪৩টি মামলা ছিল উল্লেখযোগ্য। এরপর আরও অনেক হামলার ঘটনা ঘটে। তবে এসব ঘটনায় দায়ের করা বেশির ভাগ আসামি সাবেক সরকারের সময় গ্রেপ্তার হয়নি। এমনকি অভিযুক্ত অনেক অপরাধীকে সরকারের নানা চাপের কারণে গ্রেপ্তার করা যায়নি।

গণপিটুনির মতো ঘটনা বেড়ে যাওয়ার পেছনে কিছু কারণ আছে বলে মনে করেন মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী মো. সাইদুর রহমান। তিনি বলেন, প্রথমত, এটির নেপথ্যে ছিল পরিকল্পিত উসকানি, সরকারের সহযোগী বিভিন্ন গোষ্ঠী এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় কিছু ব্যক্তি এতে ইন্ধন জোগায়। দ্বিতীয়ত, পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা একটা বড় কারণ। সর্বোপরি সরকারের উদাসীনতা ও কোনো পদক্ষেপ নিতে অনীহার কারণেই গণপিটুনির প্রবণতা বাড়ে।
অপরাধ বিশ্লেষক সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) নুরুল হুদা বলেন, ‘মব সন্ত্রাসের মাধ্যমে একজন নিরপরাধ মানুষকে পিটিয়ে হত্যা আইনের দৃষ্টিতে চরম অপরাধ। যারা এভাবে আইন নিজের হাতে তুলে নেয় তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। তা না হলে এ ধরনের ঘটনা বাড়তেই থাকবে। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সমাজে মব ভায়োলেন্স চলেছে। সামাজিক অপরাধ নিয়ন্ত্রণে থাকলে এ ধরনের ঘটনা কম ঘটবে। ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।

আরও যত ঘটনা : গত ৩১ অক্টোবর দুপুরে রাজধানীর তুরাগের রানাভোলা এলাকায় আবদুল মান্নান নামের এক নিরাপত্তাকর্মী নিহতের ঘটনায় এক কিশোর চালককে গণপিটুনি দেয় স্থানীয়রা। আগের দিন ৩০ অক্টোবর ভোলার বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামাল কলেজে সহকর্মীরা পিটিয়ে আহত করেন সেলিম আহমেদ লিটন নামের এক শিক্ষককে। এর আগে ঢাকা, রাজশাহী ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেও মব সন্ত্রাসের মাধ্যমে অনেককে হত্যা করা হয়। গাইবান্ধার গবিন্দগঞ্জ উপজেলায় চোর সন্দেহে তিনজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এ তথ্য জানিয়ে সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বুলবুল ইসলাম বলেন, ‘গরু চোর সন্দেহে তিনজনকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ পেয়ে তদন্ত চলছে।’