অণুজীবের ছবি তুলে আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেলেন কুতুব উদ্দিন

অণুজীবের ছবি তুলে আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেলেন কুতুব উদ্দিন

আন্তর্জাতিক পরিবেশ বাংলাদেশ

যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশি আলোকচিত্রী কুতুব উদ্দিন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাফল্য অর্জন করেছেন। ২০২৬ সালের ‘ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফার অব দ্য ইয়ার’ প্রতিযোগিতার পোর্টফোলিও বিভাগে বিজয়ী হয়েছেন তিনি। তাঁর পুরস্কারজয়ী ছয়টি ছবির সিরিজের নাম ‘সিক্রেট ওয়ার্ল্ড’। ছবিগুলোতে উঠে এসেছে খালি চোখে সহজে দেখা যায় না, এমন ক্ষুদ্র জীব স্লাইম মোল্ডের প্রজননকাঠামো ও বিচিত্র গঠন।

ইংল্যান্ডের পশ্চিম সাসেক্সের বিভিন্ন বনভূমিতে ছবিগুলো তুলেছেন কুতুব। মাত্র ১ থেকে ২ মিলিমিটার আকারের এসব জীবের সূক্ষ্ম গঠন, রং ও বিন্যাস ম্যাক্রো ফটোগ্রাফির মাধ্যমে ক্যামেরায় ধারণ করেছেন তিনি। স্লাইম মোল্ড দেখতে অনেকটা ছত্রাকের মতো। সাধারণত পচা কাঠ ও আর্দ্র পরিবেশে এদের দেখা মেলে।

সিরিজের একটি ছবির নাম ‘টাইনি ড্যান্সার’ বা ‘খুদে নৃত্যশিল্পী’। এতে হলুদাভ পিচ্ছিল স্তরের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সরু লালচে-বাদামি ডাঁটা এবং সেগুলোর মাথায় কালো ছোপযুক্ত হলুদাভ গোলাকার অংশ দেখা যায়। পচা কাঠের ওপর জন্মানো জীবগুলোকে দেখে মনে হয়, যেন তারা নাচছে।

আরেকটি ছবির নাম ‘আ ওয়ার্ল্ড ইন মিনিয়েচার’ বা ‘ক্ষুদ্র এক জগৎ’। এতে শর্ষের দানার সমান একটি স্লাইম মোল্ডকে বনসাই করা গাছের মতো দেখায়। এর মাথায় ফুটে থাকা সাদা ফুলের মতো গঠন ছবিটিকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা।

শখ থেকে পেশাদার আলোকচিত্রী

২০১২ সালে জন্মদিনে স্ত্রী জমিলা পারভিনের কাছ থেকে একটি ডিজিটাল ক্যামেরা উপহার পান কুতুব উদ্দিন। এরপর থেকেই আলোকচিত্রের প্রতি তাঁর আগ্রহ বাড়তে থাকে। প্রথম দিকে প্রজাপতি, মৌমাছি, ফুল, পাখি ও আশপাশের প্রকৃতির ছবি তুলতেন তিনি।

তখন একটি কুরিয়ার সার্ভিসে ডেলিভারি ম্যান হিসেবে কাজ করতেন কুতুব। কাজের পাশাপাশি ছবি তোলার দক্ষতা বাড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যান। বিভিন্ন লেখা পড়া, ইউটিউবে অন্য আলোকচিত্রীদের কাজ দেখা এবং নিজের মতো পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে শিখেছেন আলোকচিত্রের কৌশল।

একসময় বুঝতে পারেন, ছবি তোলা শুধু সুন্দর দৃশ্য ধরে রাখার মাধ্যম নয়; এর সাহায্যে প্রকৃতির অজানা গল্পও তুলে ধরা সম্ভব। সেই ভাবনা থেকেই ২০১৮ সালে পেশাদার আলোকচিত্রী হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি। ছবি বিক্রি, কর্মশালা পরিচালনা ও অন্যদের আলোকচিত্র শেখানোর মাধ্যমে ধীরে ধীরে নিজের পরিচিতি গড়ে তোলেন।

কুতুবের ভাষায়, ভালো ছবি তুলতে পারাই পেশাদার আলোকচিত্রী হওয়ার একমাত্র শর্ত নয়। নিজের কাজের প্রচার, গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং ব্যবসার দিকটিও সামলাতে হয়।

ক্ষুদ্র জগতের প্রতি মুগ্ধতা

প্রকৃতির ছবি তুলতে তুলতেই ম্যাক্রো ফটোগ্রাফির প্রতি আগ্রহ জন্মে কুতুবের। ছোট্ট পোকামাকড়ের শরীর, চোখ ও পায়ের সূক্ষ্ম গঠন ক্যামেরায় দেখে মুগ্ধ হন তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেকে ‘ম্যাক্রোম্যান’ হিসেবেও পরিচয় দেন।

স্লাইম মোল্ড, ছত্রাক, পোকামাকড় এবং তাদের সূক্ষ্ম গঠনই এখন তাঁর আগ্রহের অন্যতম প্রধান বিষয়। তাঁর মতে, ম্যাক্রো ফটোগ্রাফির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো পরিচিত পৃথিবীকে নতুনভাবে দেখা। গাছের গুঁড়ি, পচা কাঠ কিংবা শুকনো পাতার নিচে লুকিয়ে থাকা ক্ষুদ্র জগৎ ক্যামেরার সাহায্যে সামনে আসে।

এই জগৎ খুঁজতে খুব দূরে যেতে হয় না কুতুবকে। যুক্তরাজ্যের পশ্চিম সাসেক্সে তাঁর বাড়ির কাছের স্লিন্ডন উডস, পুলবরো ব্রুকস ও হেসওর্থ কমনসহ বিভিন্ন বনভূমিতে যান তিনি। বিশেষ করে বৃষ্টির পর ভেজা জঙ্গলে স্লাইম মোল্ড ও বিভিন্ন ধরনের ছত্রাক খুঁজতে পছন্দ করেন।

ছবি তোলার কাজে ক্যানন আর ৫ ক্যামেরা ও ক্যানন এমপি-ই ৬৫ মিলিমিটার ম্যাক্রো লেন্স ব্যবহার করেন কুতুব। এই লেন্স দিয়ে কোনো বস্তুকে এক থেকে পাঁচ গুণ পর্যন্ত বড় করে ধারণ করা যায়। আলো নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যবহার করেন ছোট এলইডি বাতি ও ডিফিউজার।

ছবি তোলার পর বিভিন্ন ফোকাস পয়েন্টে ধারণ করা ছবিগুলো জেরিন স্ট্যাকার সফটওয়্যারের সাহায্যে একত্র করেন। একটি ভালো ছবি পেতে কখনো ৫০, ১০০ কিংবা তারও বেশি ছবি তুলতে হয়। তাঁর একটি পুরস্কারজয়ী ছবি তৈরিতে ব্যবহার করতে হয়েছিল ১২৪টি ছবি।

তবে কুতুবের মতে, দামি সরঞ্জামের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ধৈর্য ও পর্যবেক্ষণক্ষমতা। বনে গিয়ে তিনি শুধু সামনে তাকিয়ে হাঁটেন না; মাটির কাছাকাছি, গাছের গুঁড়ি, পচা কাঠ, পাতার নিচে এবং আর্দ্র জায়গায় মনোযোগ দিয়ে ক্ষুদ্র জীব খোঁজেন।

স্লাইম মোল্ড নিয়ে দীর্ঘ অনুসন্ধান

২০২৪ সালের অক্টোবরের দিকে স্লাইম মোল্ড নিয়ে কাজ শুরু করেন কুতুব উদ্দিন। অ্যালিসন নামের এক আলোকচিত্রীর ইউটিউব ভিডিও ও ইনস্টাগ্রামে তাঁর কাজ দেখে এ বিষয়ে আগ্রহী হন। এরপর স্লাইম মোল্ড খুঁজে বের করা, ছবি তোলা এবং এদের জীবনচক্র সম্পর্কে জানার পেছনে সময় দিতে থাকেন।

২০২৫ সালের প্রায় পুরোটা সময় তিনি এই ক্ষুদ্র জীবগুলো নিয়ে কাজ করেছেন। বনভূমিতে ঘুরে তাদের জীবনচক্র বোঝার চেষ্টা করেছেন এবং ছবি তুলেছেন। দীর্ঘ অনুসন্ধানের ফল হিসেবে ছয়টি ছবির সিরিজটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এনে দিয়েছে তাঁকে।

এর আগেও ২০২৫ সালে ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফার অব দ্য ইয়ার প্রতিযোগিতায় তাঁর একটি ছবি ‘হাইলি কমেন্ডেড’ স্বীকৃতি পেয়েছিল। এবার পোর্টফোলিও বিভাগে বিজয়ী হয়ে নতুন সাফল্য অর্জন করলেন তিনি।

কুতুবের পুরস্কারজয়ী ছবিগুলো এখন লন্ডনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামে প্রদর্শিত হচ্ছে। সেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের দর্শনার্থীরা ছবিগুলো দেখছেন। অনেকে স্লাইম মোল্ড সম্পর্কে জানতে চাইছেন এবং এমন ছবি কীভাবে তোলা সম্ভব, সে বিষয়ে কৌতূহল প্রকাশ করছেন। দর্শকদের আগ্রহ তাঁর কাজকে আরও অর্থবহ করে তুলেছে বলে মনে করেন কুতুব।

তাঁর কাছে বন্য প্রাণীর আলোকচিত্র মানেই শুধু বাঘ, সিংহ কিংবা বড় প্রাণীর ছবি নয়। ক্ষুদ্র জীবও প্রকৃতির অসাধারণ গল্প তুলে ধরতে পারে। তিনি চান, তাঁর ছবি দেখে মানুষ সৌন্দর্য উপভোগ করার পাশাপাশি প্রকৃতির ছোট অথচ গুরুত্বপূর্ণ জীবগুলো সম্পর্কেও জানতে আগ্রহী হবেন।

বাংলাদেশের প্রকৃতিতে ক্ষুদ্র জীবের সন্ধানে

কুতুব উদ্দিনের জন্ম মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায়। পড়াশোনার জন্য ২০০৯ সালে যুক্তরাজ্যে যান তিনি। তাঁর ভাইবোনসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা বাংলাদেশে থাকেন। মাকে আগেই হারিয়েছিলেন; কয়েক মাস আগে মারা গেছেন তাঁর বাবাও।

আগামী বছর বাংলাদেশে আসার পরিকল্পনা রয়েছে কুতুবের। এবার দেশে ফিরে বাংলাদেশের প্রকৃতিতে স্লাইম মোল্ড ও অন্যান্য ক্ষুদ্র জীব খুঁজে সেগুলোর ছবি তুলতে চান তিনি।

কুতুবের আশা, এমন কিছু প্রজাতির সন্ধান বাংলাদেশে পাওয়া যেতে পারে, যেগুলো তিনি যুক্তরাজ্যে খুঁজে পাননি। পশ্চিম সাসেক্সের বনভূমিতে কাজ করে অর্জিত অভিজ্ঞতা এবার বাংলাদেশের প্রকৃতিতে কাজে লাগাতে চান এই আলোকচিত্রী।