পুলিশের জন্য ৬ হাজার ৬০৯ কোটি টাকার গাড়ি কেনার উদ্যোগ

পুলিশের জন্য ৬ হাজার ৬০৯ কোটি টাকার গাড়ি কেনার উদ্যোগ

দেশ জুড়ে বাংলাদেশ

বাংলাদেশ পুলিশের সক্ষমতা বাড়াতে ৬ হাজার ৬০৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫ হাজার ৮৩০টি যানবাহন কেনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ জন্য দুটি প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে সাধারণ অপারেশনাল যানবাহন কিনতে ৪ হাজার ৩২৮ কোটি টাকা এবং বিশেষায়িত যানবাহন কিনতে ২ হাজার ২৮১ কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রস্তাবিত যানবাহনের তালিকায় রয়েছে ডাবল কেবিন পিকআপ, জিপ, মাইক্রোবাস, বাস, অ্যাম্বুলেন্স, প্রিজন ভ্যান, ওয়াটার ক্যানন, আর্মড পারসোনেল ক্যারিয়ার (এপিসি), সোয়াট ভ্যান, মোটরসাইকেল ও স্পিডবোট।

২৫ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্প দুটি অনুমোদনের জন্য উপস্থাপনের কথা রয়েছে। অনুমোদন পেলে ২০২৯ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্প দুটির কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

পিকআপ কিনতেই ব্যয় ২ হাজার ৫০১ কোটি টাকা

‘বাংলাদেশ পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য অপারেশনাল যানবাহন ক্রয়’ প্রকল্পের আওতায় ৪ হাজার ৩২৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪ হাজার ৮২৯টি যানবাহন কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এর মধ্যে রয়েছে ২ হাজার ৯০৯টি ডাবল কেবিন পিকআপ। প্রতিটির প্রস্তাবিত দাম ৮৬ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে পিকআপ কেনায় ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৫০১ কোটি ৭৪ লাখ টাকা।

এ ছাড়া পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ব্যবহারের জন্য ২ হাজার ৭০০ সিসির ৪০০টি জিপ কেনার প্রস্তাব রয়েছে। প্রতিটির দাম ১ কোটি ৬৯ লাখ টাকা হিসাবে এ খাতে ব্যয় হবে ৬৭৬ কোটি টাকা। পাশাপাশি ২ হাজার সিসির ৩৪৫টি জিপ কেনার পরিকল্পনা রয়েছে, যার প্রতিটির দাম ধরা হয়েছে ৭৫ লাখ টাকা।

এ ছাড়া ৫২ লাখ টাকা দরে ২১৪টি মাইক্রোবাস কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে ব্যয় হবে ১১১ কোটি ২৮ লাখ টাকা।

পুলিশ সদস্যদের যাতায়াতের জন্য ৫২ লাখ টাকা দরে ১৪৮টি নন-এসি বড় বাস এবং ১ কোটি ২০ লাখ টাকা দরে ১৪৮টি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত মিনিবাস কেনার পরিকল্পনা রয়েছে।

অপারেশনাল যানবাহনের তালিকায় আরও রয়েছে ৯৫ লাখ টাকা দরে ১১৫টি প্রিজন ভ্যান, ৬৫ লাখ টাকা দরে ১০০টি প্যাট্রোল কার এবং ৫৫ লাখ টাকা দরে ৫০টি অ্যাম্বুলেন্স। পাশাপাশি ৮০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১০০টি স্পিডবোট কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় আরও প্রায় ৩০০টি যানবাহন কেনার পরিকল্পনা রয়েছে।

বিশেষায়িত যানবাহনে ব্যয় ২ হাজার ২৮১ কোটি টাকা

‘বাংলাদেশ পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বিশেষায়িত যানবাহন ক্রয়’ প্রকল্পের আওতায় ২ হাজার ২৮১ কোটি টাকা ব্যয়ে ১ হাজার ১টি বিশেষায়িত যানবাহন কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং পুলিশের অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা বাড়ানো এ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য।

শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষসহ বিভিন্ন পরিস্থিতি মোকাবিলায় ১৩২ কোটি টাকা ব্যয়ে ১১টি আর্মড পারসোনেল ক্যারিয়ার (এপিসি) কেনার পরিকল্পনা রয়েছে। জনশৃঙ্খলা রক্ষা ও উত্তেজিত জনসমাবেশ নিয়ন্ত্রণে ১২৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ১০ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার ২০টি ওয়াটার ক্যানন কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এ ছাড়া জনসমাবেশ ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় ২২০ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০টি ক্রাউড কন্ট্রোল ভেহিকেল এবং পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট ও বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দলের জন্য ১৮৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৫টি সোয়াট ভ্যান কেনার পরিকল্পনা রয়েছে।

জরুরি অভিযান পরিচালনার জন্য ৫৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ১০০টি বিশেষায়িত প্যাট্রোল কার এবং গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের নিরাপদে পরিবহনের জন্য ৪৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৩টি বিশেষায়িত ভ্যান কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া থানা থেকে আদালত এবং আদালত থেকে কারাগারে আসামি পরিবহনের জন্য ৩৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫৫টি প্রিজন ভ্যান কেনার পরিকল্পনা রয়েছে।

মোটরসাইকেল, স্পিডবোট ও নজরদারির গাড়ি কেনার পরিকল্পনা

বিশেষায়িত যানবাহনের তালিকায় রয়েছে ১৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০০টি উচ্চগতির মোটরসাইকেল এবং প্রশিক্ষিত পুলিশ কুকুর পরিবহনের জন্য ৫৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫০টি ইউটিলিটি টেরেইন ভেহিকেল।

দুর্গম এলাকায় অভিযান ও টহলের জন্য ৫০টি অল টেরেইন ভেহিকেল এবং পাহাড়ি এলাকায় চলাচলের জন্য ১০০টি হিল মোটরসাইকেল কেনার প্রস্তাব রয়েছে।

পুলিশের গোয়েন্দা কার্যক্রম ও মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের জন্য ছয়টি মোবাইল সার্ভিল্যান্স গাড়ি কেনা হবে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১১৪ কোটি টাকা।

উপকূলীয়, নদী ও পাহাড়ি এলাকায় দ্রুত চলাচলের জন্য ১৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৫টি কুইক রেসপন্স বোট বা স্পিডবোট কেনার পরিকল্পনা রয়েছে। পানিতে আটকে পড়া মানুষ ও দুর্ঘটনায় পড়া ব্যক্তিদের উদ্ধারে আরও ১৫টি রেসকিউ বোট কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এ ছাড়া মাঠপর্যায়ে বিভিন্ন ইউনিটের কমান্ডারদের ব্যবহারের জন্য ১৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ১০৫টি কমান্ডারস সাব-আরবান ভেহিকেল এবং মৃতদেহ পরিবহনের জন্য ৯৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ৮০টি ফ্রিজার ভ্যান কেনার পরিকল্পনা রয়েছে।

নির্বাচন, ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও সমাবেশে পুলিশ সদস্যদের ব্যবহারের জন্য ৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৮০টি স্মল ডিপ্লয়মেন্ট ইউটিলিটি ভেহিকেল কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে। পুলিশের আনুষ্ঠানিকতা ও প্রশিক্ষণের কাজে ঘোড়া পরিবহনের জন্য ১৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ১০টি বিশেষ যানবাহন কেনার পরিকল্পনাও রয়েছে।

এ প্রকল্পের আওতায় আরও প্রায় ৫৬টি যানবাহন কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে।

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের জন্যও যানবাহন

স্বরাষ্ট্রসচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, পুলিশ বাহিনীর যেসব সদস্য জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে যাবেন, তাঁদের জন্যও কিছু বিশেষায়িত যানবাহন কেনা হচ্ছে। এ বাবদ ব্যয় করা অর্থ পরবর্তী সময়ে জাতিসংঘ পরিশোধ করবে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যানবাহনের দাম নির্ধারণে পুলিশ সদর দপ্তরের একটি প্রাক্কলন কমিটি কাজ করেছে। পাঁচ সদস্যের এ কমিটিতে পুলিশের চারজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) যন্ত্রকৌশল বিভাগের একজন সহকারী অধ্যাপক রয়েছেন।

প্রকল্প দুটির সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্যও নয় সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কমিটির সভাপতি ছিলেন পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত আইজিপি) মুশফেকুর রহমান।

অভ্যুত্থানে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুলিশের ১ হাজার ৭৪টি যানবাহন

পুলিশ সদর দপ্তর ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সময় সারা দেশে পুলিশের ৪৫৫টি যানবাহন পুড়ে যায়। সব মিলিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ১ হাজার ৭৪টি যানবাহন।

পুলিশ সদর দপ্তরের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, এসব ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি পুরোনো গাড়ি অভিযানের সময় বিকল হয়ে পড়ায় যানবাহনসংকট আরও বেড়েছে। পুলিশের সাংগঠনিক কাঠামো ও সাজসরঞ্জাম তালিকায় (টিওঅ্যান্ডই) প্রয়োজনীয় যানবাহনের ঘাটতিও রয়েছে।

স্বরাষ্ট্রসচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী বলেন, অভ্যুত্থানের সময় পুলিশের অনেক গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমানে সারা দেশে অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে পুলিশকে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। এ কারণে বেশি সংখ্যায় পিকআপ কেনার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

প্রকল্পের ব্যয় ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে সংশয়

প্রকল্প দুটির বিপুল ব্যয় নিয়ে পরিকল্পনা কমিশন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে সংশয় রয়েছে। তাঁদের মতে, যানবাহন কেনার অর্থের সংস্থান করার পাশাপাশি জ্বালানি, মেরামত, যন্ত্রাংশ, বিমা ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় বহনের বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে।

বিশেষ করে এত বিপুলসংখ্যক যানবাহন কেনার পর সেগুলোর কার্যকর ব্যবহার, রক্ষণাবেক্ষণ এবং ক্রয়প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষায়িত যানবাহনের ক্ষেত্রে চালক ও সংশ্লিষ্ট সদস্যদের প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তার ব্যবস্থাও রাখতে হবে।

পুলিশের নিজস্ব রক্ষণাবেক্ষণব্যবস্থা থাকলেও নতুন যানবাহনগুলোর দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন ব্যয় কীভাবে বহন করা হবে, তা নিয়ে আলোচনা চলছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

প্রকল্প দুটি একনেকে অনুমোদন পেলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যানবাহন কেনা ও সরবরাহের কার্যক্রম সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে চূড়ান্ত ব্যয়, যানবাহনের সংখ্যা ও ক্রয়প্রক্রিয়া প্রকল্প অনুমোদন এবং পরবর্তী বাস্তবায়ন পর্যায়ে নির্ধারিত হবে।