যুক্তরাষ্ট্রে আগামী মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে মধ্যবর্তী নির্বাচন। এবারের নির্বাচনে চিকিৎসক, নার্স ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞসহ অন্তত ১২৫ জন স্বাস্থ্য খাতের পেশাজীবী প্রার্থী হয়েছেন। সিএনএনের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
নির্বাচনে স্বাস্থ্য খাতের পেশাজীবীদের এত বিপুলসংখ্যক অংশগ্রহণকে নজিরবিহীন হিসেবে দেখা হচ্ছে। অতীতে করপোরেট প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ কিংবা আদালতের তুলনায় রাজনীতিতে এসে নির্বাচিত পদে দায়িত্ব নেওয়ার সুযোগ তাদের জন্য অনেক কম ছিল।
কভিড-১৯ মহামারির পর থেকে স্বাস্থ্য খাতের এসব পেশাজীবীর রাজনীতিতে অংশগ্রহণের প্রবণতা বাড়তে শুরু করে। মহামারির শুরুর দিকে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা ব্যাপক প্রশংসা পেলেও সময়ের সঙ্গে তাদের কাজের চাপ ও নানা কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ নিয়ে অবিশ্বাস তৈরি হয় এবং রাজনৈতিক কারণে তাদের আক্রমণের শিকার হতে হয়।
কয়েকজন প্রার্থী জানিয়েছেন, মহামারির অভিজ্ঞতা থেকে তারা উপলব্ধি করেছেন, স্বাস্থ্য ও বিজ্ঞান বিষয়ে তাদের প্রশিক্ষণ এবং অভিজ্ঞতার সঙ্গে সরকার ও রাজনীতির সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। আগে তারা বিষয়টিকে যতটা গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন, বাস্তবে তা আরও বেশি।
মিশিগানের ওয়েইন কাউন্টির সাবেক স্বাস্থ্য পরিচালক ড. আব্দুল এল-সায়েদ এবার মার্কিন সিনেট নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
রাজনীতি ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের কাজের মধ্যে মিল তুলে ধরে তিনি বলেন, চিকিৎসাবিজ্ঞানে মানুষের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, যন্ত্রণায় থাকা মানুষের পাশে বসা এবং শরীরের কার্যপ্রণালী ও স্বাস্থ্য সম্পর্কে জ্ঞান কাজে লাগিয়ে সম্ভাব্য পথ তুলে ধরতে শেখানো হয়। তার মতে, রাজনীতির কাজও অনেকটা একই রকম।
প্রতিরোধমূলক চিকিৎসাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ড. অ্যামি অ্যাক্টন একসময় ওহাইওর রিপাবলিকান গভর্নর মাইক ডিওয়াইনের অধীনে জনস্বাস্থ্য পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এবার তিনি ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিসেবে রাজ্যটির গভর্নর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান দলের বায়োটেক খাতের ধনকুবের বিবেক রামাস্বামী।
অন্যদিকে, ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর পদে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন জেভিয়ার বেসেরা। তিনি সাবেক কংগ্রেসম্যান এবং প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনে স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ নির্বাচনে তার প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান ঘরানার গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব স্টিভ হিলটন।
সাউথ ক্যারোলাইনার ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ও শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. অ্যানি অ্যান্ড্রুজ এবার মার্কিন সিনেট নির্বাচনে রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
প্রার্থীদের তালিকায় স্বাস্থ্য খাতের সংশ্লিষ্ট শিল্পে কাজের অভিজ্ঞতা থাকা ব্যক্তিরাও রয়েছেন। তাদের মধ্যে আছেন স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ক আইনজীবী সিন্ডি ওয়ার্মিংটন। তিনি নিউ হ্যাম্পশায়ারের গভর্নর পদে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন। অন্যদিকে, জর্জিয়ার গভর্নর পদে রিপাবলিকান প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন রিক জ্যাকসন। তিনি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ‘জ্যাকসন হেলথকেয়ার’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা।
রাটগার্স ইউনিভার্সিটির ‘ঈগলটন সেন্টার অন দ্য আমেরিকান গভর্নর’-এর পরিচালক ও ইতিহাসবিদ ডা. ক্রিস্টোফার শিল্ডস বলেন, বিজ্ঞান ও রাজনীতির মধ্যকার সম্পর্ক বরাবরই কিছুটা দুর্বল। বর্তমান মার্কিন কংগ্রেসের ১০ শতাংশেরও কম সদস্যের চিকিৎসাবিজ্ঞান, জনস্বাস্থ্য বা প্রকৌশল বিষয়ে ডিগ্রি রয়েছে। অন্যদিকে, সিনেটের ৪৭ শতাংশ এবং প্রতিনিধি পরিষদের ৩১ শতাংশ সদস্যের আইন বিষয়ে ডিগ্রি রয়েছে।
মার্কিন কংগ্রেসে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—উভয় দলের চিকিৎসকদের ছোট হলেও সক্রিয় দুটি গোষ্ঠী রয়েছে। বর্তমানে মার্কিন সিনেটে স্বাস্থ্যসেবা খাতের অভিজ্ঞতা রয়েছে এমন চারজন সদস্য আছেন। তারা সবাই রিপাবলিকান দলের এবং পেশায় চিকিৎসক। তারা হলেন ওয়াইওমিংয়ের জন ব্যারাসো, লুইজিয়ানার বিল ক্যাসিডি, কানসাসের রজার মার্শাল এবং কেনটাকির র্যান্ড পল।
অন্যদিকে, প্রতিনিধি পরিষদে রয়েছেন ১৭ জন চিকিৎসক, চারজন দন্তচিকিৎসক, দুজন ফার্মাসিস্ট, একজন নার্স প্র্যাকটিশনার, একজন অপটোমেট্রিস্ট এবং একজন পুনর্বাসন থেরাপিস্ট।
রাজ্য পর্যায়েও আইনপ্রণেতাদের মধ্যে চিকিৎসক, বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীদের সংখ্যা আরও কম। শুধু তা-ই নয়, এ সংখ্যা দিন দিন কমছে। রাটগার্স ইউনিভার্সিটির ‘সায়েন্টিস্টস ইন স্টেট পলিটিক্স ডেটাবেস’ নিয়ে করা এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাজ্য আইনসভাগুলোর সদস্যদের মাত্র ৩ শতাংশের চিকিৎসা, বিজ্ঞান বা প্রকৌশল বিষয়ে পেশাগত পটভূমি ছিল। আগের বছরের তুলনায় এ হার ২৫ শতাংশ কম।
যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্যের মধ্যে একমাত্র হাওয়াইয়ের গভর্নর জশ গ্রিনের চিকিৎসাশাস্ত্রে ডিগ্রি রয়েছে। তবে কোনো অঙ্গরাজ্যের গভর্নরেরই জনস্বাস্থ্য বিষয়ে ডিগ্রি নেই। এ ছাড়া এখন পর্যন্ত কোনো চিকিৎসক যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হননি।
দেশটির নবম প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম হেনরি হ্যারিসন একসময় মেডিকেল স্কুলে পড়াশোনা শুরু করেছিলেন। তবে অর্থাভাবে তাকে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে হয়। পরে তিনি সৈনিক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।
