চার বছর আগে কাতার বিশ্বকাপে ইতিহাস গড়ে ফুটবল বিশ্বকে চমকে দিয়েছিল মরক্কো। কোয়ার্টার ফাইনালে পর্তুগালকে হারিয়ে প্রথম আফ্রিকান দল হিসেবে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে উঠে ‘আটলাস লায়ন্স’রা লিখেছিল নতুন ইতিহাস। ইউসুফ এন-নেসিরির দুর্দান্ত হেড, হাকিম জিয়েচের নৈপুণ্য এবং ম্যাচ শেষে সৌফিয়ান বুফালের মায়ের সঙ্গে আবেগঘন উদযাপন আজও ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে অমলিন।
তবে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে সেই মরক্কো দলকে যেন নতুন রূপে দেখা যাচ্ছে। আগের দলের গুরুত্বপূর্ণ ফুটবলার এন-নেসিরি, জিয়েচ, বুফাল এবং তৎকালীন কোচ ওয়ালিদ রেগরাগুই এবার আর দলে নেই। পুরোনো দলের কেবল আশরাফ হাকিমি, নুসাইর মাজরাউই, আজেদিন উনাহি, বিলাল এল-খানুস এবং গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনোসহ কয়েকজন অভিজ্ঞ খেলোয়াড় আছেন।
দল বদলালেও বদলায়নি মরক্কোর লড়াকু মানসিকতা। ‘রাউন্ড অব ৩২’-এ নেদারল্যান্ডসকে টাইব্রেকারে হারিয়ে শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছে উত্তর আফ্রিকার দেশটি। যদিও গ্রুপ পর্বে ব্রাজিলের নিচে রানার্সআপ হওয়ায় কিছু সমালোচনার মুখেও পড়তে হয়েছে দলটিকে।
বাংলাদেশ সময় শনিবার (৪ জুলাই) রাত ১১টায় যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টনে শেষ ষোলোতে কানাডার মুখোমুখি হবে মরক্কো। এই ম্যাচে স্পষ্ট ফেভারিট হিসেবেই মাঠে নামছে তারা। জয় পেলে কোয়ার্টার ফাইনালে ২০২২ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে তাদের বিদায় নিশ্চিত করা ফ্রান্সের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
২০২২ বিশ্বকাপে ওয়ালিদ রেগরাগুইয়ের অধীনে মরক্কোর মূল শক্তি ছিল সংগঠিত রক্ষণ এবং দ্রুত পাল্টা আক্রমণ। প্রতিপক্ষকে বলের দখল ছেড়ে দিয়ে সুযোগ বুঝে আঘাত হানাই ছিল তাদের সফল কৌশল।
তবে ২০২৫ আফ্রিকা কাপ অব নেশনস জয়ের পরও কোচ রেগরাগুইকে ঘিরে বিতর্ক থামেনি। শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপের আগে দায়িত্ব দেওয়া হয় যুব দলের সফল কোচ মোহাম্মদ উহাবিকে।
উহাবির অধীনে মরক্কোর ফুটবলের দর্শনেও এসেছে বড় পরিবর্তন। তরুণ, গতিময় এবং আক্রমণভাগে স্বাধীনভাবে অবস্থান বদল করতে সক্ষম খেলোয়াড়দের নিয়ে নতুন দল গড়েছেন তিনি।
২০২৪ অলিম্পিকে ব্রোঞ্জ, আফ্রিকান নেশনস চ্যাম্পিয়নশিপ এবং আরব কাপ জয়ের অভিজ্ঞতা থেকে উঠে আসা এই নতুন প্রজন্ম ইতোমধ্যেই বিশ্বকাপে নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছে। উদ্বোধনী ম্যাচেই পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে ১-১ গোলে রুখে দেয় মরক্কো।
ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, ২০৩০ সালে নিজ দেশে বিশ্বকাপ আয়োজনকে সামনে রেখে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় এগোচ্ছে মরক্কো। বর্তমান দলের গড় বয়সও ২৬ বছরের নিচে, যা ভবিষ্যতের জন্য বড় সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
২০২৫ আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের ফাইনাল ঘিরে বিতর্কে নিরপেক্ষ সমর্থকদের একাংশের সমর্থন হারালেও এবারের বিশ্বকাপে সাহসী পারফরম্যান্স দিয়ে সেই আস্থা অনেকটাই ফিরিয়ে এনেছে দলটি।
মাঠের বাইরেও নজর কেড়েছে কয়েকটি আবেগঘন মুহূর্ত। হাইতির বিপক্ষে গোলের পর সতীর্থ গেসিম ইয়াসিনকে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের আহ্বান জানান নুসাইর মাজরাউই। অন্যদিকে নেদারল্যান্ডসকে হারানোর পর মায়ের সঙ্গে আবেগঘন উদযাপনে মেতে ওঠেন ইসমাইল সাইবারি। এসব দৃশ্য আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে ২০২২ সালের সেই আবেগঘন মরক্কোকে।
অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনোও টাইব্রেকারে নিজের দৃঢ়তা দেখিয়ে দলের জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
দল বদলেছে, কোচ বদলেছে, কৌশলও বদলেছে। কিন্তু মরক্কোর স্বপ্ন একই রয়েছে। টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপে ইতিহাস গড়ে আরও দূর এগিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নিয়েই এগোচ্ছে আফ্রিকা ও আরব বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী এই ফুটবল দল।
