অরুণাচলের ৬-৭ কিলোমিটার ভেতরে কি ঢুকে পড়েছে চীনা বাহিনী?

অরুণাচলের ৬-৭ কিলোমিটার ভেতরে কি ঢুকে পড়েছে চীনা বাহিনী?

আন্তর্জাতিক

ভারতের অরুণাচল প্রদেশের চীন সীমান্তে উত্তেজনা ও অস্থিরতা নিয়ে বক্তব্য দিয়েছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা (এলএসি) বরাবর অমীমাংসিত বিষয়গুলোর সমাধান এবং ভুল-বোঝাবুঝি এড়াতে চীন ও ভারতের মধ্যে কূটনৈতিক ও সামরিক পর্যায়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে নয়াদিল্লি।

শুক্রবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল বলেন, সীমান্ত এলাকায় চীনা বাহিনী নির্ধারিত টহলব্যবস্থা থেকে সরে এলে বিভিন্ন সময়ে পরিস্থিতি অশান্ত হয়ে ওঠে। তবে শুক্রবার রাত পর্যন্ত এ বিষয়ে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

 অরুণাচল সীমান্তে চীনা সেনাদের সঙ্গে মুখোমুখি অবস্থানের দাবি

ভারতের ইন্দো-তিব্বত সীমান্ত পুলিশের (আইটিবিপি) মহাপরিচালক শত্রুজিৎ সিং কাপুরের বক্তব্যের পর সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার এক অনুষ্ঠানে তিনি দাবি করেন, অরুণাচল প্রদেশের একাধিক স্থানে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) সঙ্গে মুখোমুখি অবস্থানের সময় আইটিবিপির সদ্য গঠিত ‘শৌর্য কমান্ডো ইউনিট’ নিজেদের সক্ষমতা দেখিয়েছে।

রাজস্থানের আলোয়ারে সেন্ট্রাল ট্রেনিং কলেজে আইটিবিপির কর্মীদের এক অনুষ্ঠানে কাপুর বলেন, নতুন গঠিত শৌর্য কমান্ডোরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। উচ্চ পার্বত্য এলাকায় যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতা বাড়াতে ভারতীয় সেনাবাহিনীর বাইরে একটি বিশেষায়িত বাহিনী গড়ে তোলা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

কাপুরের ভাষ্য অনুযায়ী, ভবিষ্যতে শৌর্য কমান্ডোদের একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যাটালিয়ন গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে। উচ্চতাপূর্ণ দুর্গম এলাকায় মোতায়েন থেকে অভিযান পরিচালনা করাই হবে এই বাহিনীর অন্যতম সক্ষমতা।

এলএসি থেকে ৬-৭ কিলোমিটার ভেতরে চীনা সেনাদের অবস্থানের দাবি

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে সরকারি সূত্রের বরাতে দাবি করা হয়েছে, অরুণাচল প্রদেশের টাকসিংয়ের কাছে আসাফিলা এলাকায় জুলাই মাসের শেষ দিক থেকে ভারত ও চীনের সেনাদের মধ্যে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

‘দ্য হিন্দু’র প্রতিবেদনে উদ্ধৃত সূত্রের দাবি, উচ্চ সুবানসিরি জেলার টাকসিং সার্কেলের মাঞ্জা এলাকার কাছে চীনা সেনারা তাঁবু স্থাপন করেছে। ভারতের ধারণা করা প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা থেকে প্রায় ৬ থেকে ৭ কিলোমিটার ভেতরে তাদের অবস্থান বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাই মাসে নিয়মিত টহলের সময় মাঞ্জার কাছে ভারতীয় ও চীনা সেনারা মুখোমুখি হন। সংক্ষিপ্ত বিরোধের পর উভয় পক্ষ ফিরে গেলেও কয়েক দিন পর চীনা বাহিনী বেশি সংখ্যায় ফিরে এসে ওই এলাকায় অবস্থান নেয় বলে সূত্রের দাবি।

স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্যের বরাত দিয়েও ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে একই ধরনের দাবি প্রকাশিত হয়েছে। তবে চীনা সেনারা প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা অতিক্রম করে ভারতের ভূখণ্ডে প্রবেশ করেছে কি না, সে বিষয়ে দুই দেশের বক্তব্য ও স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে, ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরণ রিজিজু আগস্টের শেষ দিকে চীনা সেনারা ভারতের ৬০ কিলোমিটার ভেতরে প্রবেশ করেছে—এমন প্রচারকে মিথ্যা বলে মন্তব্য করেছিলেন। তবে সীমান্ত অঞ্চলে কিছু সমস্যা থাকার কথাও তিনি স্বীকার করেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

পুরোনো অস্ত্র নিয়ে উদ্বেগ, ড্রোন ব্যবহারে জোর

আইটিবিপি মহাপরিচালক শত্রুজিৎ সিং কাপুর সীমান্তে ব্যবহৃত অস্ত্রের আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আইটিবিপির ব্যবহৃত কিছু অস্ত্র প্রায় ৫০ বছরের পুরোনো। বর্তমান পরিস্থিতিতে এসব অস্ত্র আধুনিকায়ন করা প্রয়োজন।

তিনি ড্রোনের মতো আধুনিক প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। কাপুরের মতে, অস্ত্র ও অবকাঠামোর আধুনিকায়নে চীন ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। ফলে সীমান্তে কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালনের জন্য ভারতেরও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।

ইউক্রেন ও ইরানের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, ড্রোন প্রযুক্তি সামরিক পরিস্থিতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। এ ছাড়া আগামী তিন বছরে চীন সীমান্তে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভূগর্ভস্থ আশ্রয়কেন্দ্র বা বাঙ্কার নির্মাণের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।

সীমান্ত নিয়ে ভারত-চীনের একাধিক বৈঠক

সীমান্তে উত্তেজনা থাকলেও ভারত ও চীনের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সীমান্তবিষয়ক ওয়ার্কিং মেকানিজম ফর কনসালটেশন অ্যান্ড কো-অর্ডিনেশন (ডব্লিউএমসিসি)-এর ৩৬তম বৈঠক ৬ আগস্ট অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ২৬ আগস্ট বেইজিংয়ে দুই দেশের বিশেষ প্রতিনিধিদের ২৫তম দফার আলোচনা হয়। এতে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল।

এ ছাড়া ৬ সেপ্টেম্বর পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্ত এলাকায় দুই দেশের সেনাবাহিনীর কোর কমান্ডার পর্যায়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল বলেন, সীমান্তের উন্নত ব্যবস্থাপনার জন্য প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা সম্পর্কে দুই দেশের পারস্পরিক ধারণা ও বোঝাপড়া বাড়াতে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে উভয় পক্ষ সম্মত হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, সীমান্ত এলাকায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা ভারত-চীন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সার্বিক উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য।

সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের সমালোচনায় কংগ্রেস

আইটিবিপি মহাপরিচালকের বক্তব্যের পর ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস কেন্দ্রীয় সরকারের সমালোচনা করেছে। দলটির সংসদ সদস্য জয়রাম রমেশ অভিযোগ করেছেন, অরুণাচল প্রদেশের সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে সরকার স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারছে না।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্টে তিনি সীমান্তে টহল দেওয়ার সুযোগ, চীনের বিভিন্ন স্থানের নাম পরিবর্তন এবং অবকাঠামো নির্মাণের বিষয়গুলো তুলে ধরে সরকারের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

জয়রাম রমেশের অভিযোগ, লাদাখের মতো অরুণাচল প্রদেশেরও কয়েকটি টহল এলাকায় ভারতের নিয়ন্ত্রণ সীমিত হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য বিবেচনা করা প্রয়োজন।

চীনের সঙ্গে সীমান্ত উত্তেজনার পাশাপাশি দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারত ও চীনের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বেড়েছে। তবে বাণিজ্যসংক্রান্ত পরিসংখ্যান এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি বা কূটনৈতিক সূত্র থেকে যাচাই করা প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে, অরুণাচল সীমান্তের পরিস্থিতি নিয়ে ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ, আইটিবিপির সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা—এই তিনটি বিষয় নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে। সীমান্তে শান্তি বজায় রাখা এবং ভুল-বোঝাবুঝি এড়াতে দুই দেশের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ অব্যাহত রাখা গুরুত্বপূর্ণ।