বাংলাদেশে নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও কীভাবে চলছে ক্রিপ্টো লেনদেন?

বাংলাদেশে নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও কীভাবে চলছে ক্রিপ্টো লেনদেন?

অর্থনীতি আন্তর্জাতিক

ক্রিপ্টোকারেন্সি মূলত ব্লকচেইন নামের বিকেন্দ্রীভূত নেটওয়ার্কে লেনদেন করা হয়। প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার মতো এখানে কোনো একক প্রতিষ্ঠান প্রতিটি লেনদেন অনুমোদন করে না। ব্যবহারকারীর ডিজিটাল ওয়ালেট থেকে অন্য ওয়ালেটে ক্রিপ্টো পাঠানো হলে নেটওয়ার্কের কম্পিউটারগুলো সেই লেনদেন যাচাই করে ব্লকচেইনে যুক্ত করে।

২০১৭ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক বিটকয়েনে লেনদেন না করার বিষয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়, ভার্চ্যুয়াল মুদ্রা কোনো দেশের বৈধ কর্তৃপক্ষ ইস্যু করে না। ফলে এর বিপরীতে আর্থিক দাবির কোনো স্বীকৃতিও নেই। তবে আন্তর্জাতিক ব্লকচেইন অ্যানালিটিকস প্রতিষ্ঠান চেইনঅ্যানালাইসিসের তথ্য অনুযায়ী, তৃণমূল পর্যায়ে ক্রিপ্টো ব্যবহারের দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম দেশ।

আইনগত কড়াকড়ি থাকা সত্ত্বেও দেশের তরুণ ও ফ্রিল্যান্সারদের একটি অংশ ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করছেন। কীভাবে এই লেনদেন হচ্ছে, কী কারণে ব্যবহার বাড়ছে এবং সরকার কতটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে—এসব প্রশ্ন রয়েছে।

যেভাবে হয় ক্রিপ্টো লেনদেন

বাংলাদেশে সাধারণ ব্যবহারকারীদের মধ্যে ক্রিপ্টো কেনাবেচার প্রচলিত একটি পদ্ধতি হলো পিয়ার-টু-পিয়ার (পিটুপি) লেনদেন। নেদারল্যান্ডসের ইউনিভার্সিটি অব আমস্টারডামের সিকিউরিটি অ্যান্ড নেটওয়ার্ক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাস্টার্সের গবেষক মোহাম্মদ সুমন মোল্লা প্রথম আলোকে জানান, ক্রেতারা সাধারণত এক্সচেঞ্জের পিটুপি প্ল্যাটফর্মে গিয়ে ইউএসডিটি বা অন্য কোনো ক্রিপ্টো কেনার অর্ডার দেন।

এ ক্ষেত্রে বিক্রেতার ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জের এস্ক্রো ব্যবস্থায় সাময়িকভাবে আটকে রাখা হয়। ক্রেতা ব্যাংক হিসাব বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বিক্রেতাকে টাকা পাঠান। বিক্রেতা টাকা পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করলে ক্রিপ্টো ক্রেতার ওয়ালেটে চলে যায়।

ক্রিপ্টো ব্যবহার করে দেশের টাকা পরোক্ষভাবে বিদেশেও পাঠানো সম্ভব। এ ধরনের লেনদেনে স্থানীয় পর্যায়ে টাকা দেওয়া হলেও অন্য দেশে ক্রিপ্টো স্থানান্তর করা হতে পারে। পরে প্রাপক বিদেশি এক্সচেঞ্জ বা পিটুপি বাজারে ক্রিপ্টো বিক্রি করে স্থানীয় মুদ্রা গ্রহণ করতে পারেন।

কিছু ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে হুন্ডি নেটওয়ার্ক যুক্ত হতে পারে। তখন বাংলাদেশে দেওয়া টাকার বিপরীতে বিদেশে অন্য কোনো ব্যক্তি বা এজেন্ট অর্থ পরিশোধ করেন। ক্রিপ্টো স্থানান্তরের মাধ্যমে দুই পক্ষের হিসাব সমন্বয় করা হয়। এতে দেশের টাকা সরাসরি সীমান্ত পার না হলেও অর্থের মূল্য এক দেশ থেকে অন্য দেশে চলে যায়।

কেন বাড়ছে ক্রিপ্টো ব্যবহার

প্রযুক্তিবিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের ক্রমবর্ধমান ফ্রিল্যান্সিং খাত ক্রিপ্টো ব্যবহারের অন্যতম চালিকা শক্তি। আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে পেপ্যাল বাংলাদেশে পূর্ণাঙ্গভাবে চালু না থাকা এবং প্রচলিত ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ আনতে ফি ও সময় লাগার কারণে কিছু ফ্রিল্যান্সার ক্রিপ্টোকে বিকল্প মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছেন।

তাঁরা আন্তর্জাতিক ক্লায়েন্টদের কাছ থেকে মার্কিন ডলারের সমমূল্যের ইউএসডিটি গ্রহণ করেন। এরপর পিটুপি বিক্রেতার মাধ্যমে স্থানীয় মুদ্রায় রূপান্তর করে টাকা তুলে নেন।

আর্থিক খাতের বিশ্লেষক মোস্তাফিজুর রহমান জানান, পেশাদার ট্রেডিংয়ের বাইরে তরুণদের একটি অংশ অনলাইন ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে ক্রিপ্টো অর্জন করছেন। টেলিগ্রাম ও ডিসকর্ডের বিভিন্ন গ্রুপে যুক্ত হয়ে তাঁরা গেম, ক্রিপ্টো প্রকল্পের প্রচার এবং ডেটা টেস্টে অংশ নিয়ে টোকেন পেয়ে থাকেন। পরবর্তী সময়ে এসব টোকেন আন্তর্জাতিক এক্সচেঞ্জে বিক্রি করে পিটুপি পদ্ধতিতে টাকায় রূপান্তর করা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন সময়ে গণবিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়েছে, ক্রিপ্টোকারেন্সির কোনো সার্বভৌম নিশ্চয়তা নেই। এ ধরনের লেনদেন মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসবাদে অর্থায়নের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

নিষেধাজ্ঞা থাকলেও নিয়ন্ত্রণ কতটা সম্ভব

ডিজিটাল অর্থনীতি বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ক্রিপ্টো লেনদেন পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন। ভারত ক্রিপ্টো লেনদেনের ওপর ৩০ শতাংশ কর আরোপ করে তা নজরদারির আওতায় এনেছে। বাংলাদেশে ক্রিপ্টো লেনদেন অনানুষ্ঠানিক থাকায় এর প্রবাহ ও অর্থের উৎস সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া কঠিন।

মোহাম্মদ সুমন মোল্লার মতে, ক্রিপ্টো নেটওয়ার্ক কোনো একটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সরকার এক্সচেঞ্জের কার্যক্রম সীমিত করতে, ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তর নজরদারি করতে এবং সন্দেহজনক হিসাব পর্যবেক্ষণ করতে পারে।

তবে শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ব্যবহার বন্ধ করা সম্ভব নয়। ব্যবহারকারীরা বিদেশি প্ল্যাটফর্ম, ব্যক্তিগত ওয়ালেট ও অনানুষ্ঠানিক পিটুপি নেটওয়ার্কে চলে যেতে পারেন। এতে লেনদেন বন্ধ না হয়ে বরং সরকারের নজরদারির বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্রিপ্টো লেনদেনের ঝুঁকি মোকাবিলায় স্পষ্ট আইন, লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্ল্যাটফর্ম, গ্রাহকের পরিচয় যাচাই (কেওয়াইসি), সন্দেহজনক লেনদেন পর্যবেক্ষণ এবং কর ও রিপোর্টিংয়ের কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন। এতে ক্রিপ্টো লেনদেন পুরোপুরি বন্ধ না হলেও এর প্রবাহ, ঝুঁকি ও অর্থের উৎস সম্পর্কে সরকারের নজরদারি বাড়ানো সম্ভব হবে।