মাথায় ছোট ছোট চুলে রঙিন ব্যান্ড বাঁধা হাসিখুশি এক শিশু—১০ মাস বয়সী সোহা মনি। কয়েকদিন আগেও যার হাসি ভেসে বেড়াত, আজ সে নেই। হাম ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে গত ১০ এপ্রিল মৃত্যু হয়েছে তার। চারটি হাসপাতাল ঘুরে শেষ পর্যন্ত রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট-এর শ্বাসতন্ত্রের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আরআইসিইউ) তার মৃত্যু হয়। মাদারীপুর সদরের খোয়াজপুর ইউনিয়নের পখিরা গ্রামের বাসিন্দা সোহা মনিকে পরে গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয়। পরিবারের সদস্যরা এখনও মেনে নিতে পারছেন না এই মৃত্যু।
সোহার টিকা কার্ডে অন্যান্য টিকার তথ্য থাকলেও ৯ মাস বয়সে দেওয়ার কথা থাকা হাম ও রুবেলার এমআর টিকার ঘরটি খালি ছিল। শিশুটির মা লিমা আক্তার জানান, তিনি তিনবার স্থানীয় টিকাকেন্দ্রে গিয়েও টিকা পাননি। পরে সদর হাসপাতালে গেলেও নির্ধারিত কেন্দ্র ছাড়া টিকা দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানানো হয়।
লিমা আক্তারের ভাষায়, মেয়ের সামান্য জ্বর হলেও চিকিৎসকের কাছে নিতেন তিনি। কিন্তু শুধু একটি টিকা না পাওয়ার কারণে সন্তানকে হারাতে হয়েছে—এ আক্ষেপ তাকে তাড়া করে ফিরছে।
গত ২৬ মার্চ জ্বর নিয়ে স্থানীয় চিকিৎসকের কাছে নেওয়ার পর ২৯ মার্চ মাদারীপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয় সোহাকে। এরপর একের পর এক হাসপাতাল বদল করতে থাকে পরিবারটি। সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে একাধিক হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া হলেও কোথাও পর্যাপ্ত সুবিধা মেলেনি।
মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল-এ কয়েকদিন চিকিৎসা চললেও সেখানে ভেন্টিলেটর সুবিধা না থাকায় অবস্থার অবনতি ঘটে। পরে শ্যামলীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে প্রতিদিন চিকিৎসা ব্যয় ছিল প্রায় ২৮ হাজার টাকা।
অবশেষে শিশু হাসপাতালে সিট খালি হলে ৯ এপ্রিল আবার সেখানে নেওয়া হয় সোহাকে। তবে তখন তার অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। চিকিৎসকেরা আশঙ্কা প্রকাশ করেন, তাকে আর বাঁচানো সম্ভব নয়। শেষ পর্যন্ত ১০ এপ্রিল মৃত্যু হয় শিশুটির।
চিকিৎসার পেছনে তিন লাখ টাকার বেশি খরচ হয়েছে বলে জানিয়েছে পরিবার। জমির গরু বিক্রি, গয়না বিক্রি এবং আত্মীয়স্বজনের সহায়তায় চিকিৎসা চালিয়েও শেষ রক্ষা হয়নি।
সোহার চাচা রাশেদুল ইসলাম বলেন, এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছোটাছুটি করেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাওয়া যায়নি। কোথাও টিকা নেই, কোথাও ওষুধ নেই, কোথাও আইসিইউ সুবিধার ঘাটতি—এ পরিস্থিতি নিয়ে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
চিকিৎসকদের একজন জানান, সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের আইসিইউতে ছোট শিশুদের জন্য ভেন্টিলেটর সুবিধা নেই, যা বড় একটি সীমাবদ্ধতা।
এ ঘটনায় জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা, টিকা সরবরাহ ও হাসপাতালের সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত টিকাদান নিশ্চিত করা গেলে এ ধরনের মৃত্যু অনেকাংশেই প্রতিরোধ করা সম্ভব।
