ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা থেকে বিদায় নেওয়ার মাত্র কয়েক দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সই করে ভয়াবহ অসম বাণিজ্যচুক্তি। দেশের সবাইকে অন্ধকারে রেখে করা এই চুক্তি এখন বাংলাদেশের জন্য গলার ফাঁস। ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে অর্থনীতি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একতরফা বাণিজ্যচুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশকে মার্কিন পণ্যের অবাধ বাজারে পরিণত করা হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, বিকিয়ে দেওয়া হয়েছে দেশের সার্বভৌমত্ব।
এই চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশকে পরিণত করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক কলোনিতে। সামনে মহাবিপর্যয়ের আশঙ্কাও করছেন বিশেষজ্ঞরা।
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) রাজধানীতে এক সমাবেশে বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বাণিজ্যচুক্তি বাংলাদেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে এবং লাখ লাখ মানুষ কর্মসংস্থান হারাবে।’ সংসদে আলোচনা করে সর্বসম্মতিক্রমে এই চুক্তি প্রত্যাখ্যানের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার অনেকগুলো সর্বনাশা কাজ করেছে।
তাদের অনেকে হয়তো এখন বিদেশে থাকেন। যেখানেই থাকুক, তাদের বিচার করা বর্তমান সরকারের দায়িত্ব।’ শুক্রবার রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে ‘জাতীয় স্বার্থবিরোধী মার্কিন বাণিজ্যচুক্তি বাতিলের দাবিতে’ গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সমাবেশে আনু মুহাম্মদ এসব কথা বলেন।
পরদিন রাজধানী এক অনুষ্ঠানে অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে মার্কিন বাণিজ্যিক চুক্তি জ্বালানি আমদানিতে হরমুজ প্রণালির চেয়েও বড় বাধা।
বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচনের কয়েক দিন আগে গত ৯ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকার ও ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যে বাণিজ্যচুক্তি সই হয়। সে সময় ‘নন-ডিসক্লোজার’ অ্যাগ্রিমেন্টের দোহাই দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার দাবি করে, চুক্তির কোনো শর্তই প্রকাশ করা যাবে না। তবে এর পরপরই পুরো চুক্তি ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে যুক্তরাষ্ট্র সরকার।
এতে দেখা যায়, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্কহার ১ শতাংশ কমিয়ে ১৯ শতাংশ করার আড়ালে রয়েছে ভয়ংকর শুভংকরের ফাঁকি। বিশেষ করে বাণিজ্য, জ্বালানি ও নিরাপত্তার মতো সংবেদনশীল খাতে বাংলাদেশের নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
চুক্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশ যদি অন্য কোনো দেশের সঙ্গে ডিজিটাল বাণিজ্যচুক্তি করে এবং তাতে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হলে ওয়াশিংটন বাণিজ্যচুক্তি বাতিল করতে পারবে। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশি পণ্যে আবারও ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র যেসব দেশকে ‘নন-মার্কেট কান্ট্রি’ বা বাজার অর্থনীতির দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না তাদের সঙ্গেও বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য বা অগ্রাধিকারমূলক চুক্তি করতে পারবে না। বাণিজ্যচুক্তিতে এমন একটি ধারা রয়েছে, যার ফলে বাংলাদেশ ‘যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ ক্ষুণ্নকারী’ কোনো দেশ থেকে পারমাণবিক চুল্লি, জ্বালানি রড বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কিনতে পারবে না।
চুক্তির নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এর আওতায় বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের ৬ হাজার ৭১০টি পণ্যে শুল্কছাড় দিয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ পেয়েছে ১ হাজার ৬৩৮ পণ্যে পাল্টা শুল্কছাড়। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি কার্যকর হওয়ার দিন থেকেই ৪ হাজার ৫০০টি পণ্য বাংলাদেশে রপ্তানির ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে গবাদি পশু, মাংস, মাছ, রাসায়নিক দ্রব্য, বস্ত্র, যন্ত্রপাতি ও বিভিন্ন ধরনের শিল্পপণ্য।
এ ছাড়া ১ হাজার ৫৩৯টি পণ্যের শুল্ক চুক্তি কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অর্ধেক কমে যাবে। বাকি অর্ধেক পরবর্তী চার বছর ধরে সমানভাবে কমবে। পঞ্চম বছরের ১ জানুয়ারি থেকে এসব পণ্য পুরোপুরি শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। এর বাইরে ৬৭২টি মার্কিন পণ্যের ক্ষেত্রে শুরুতে শুল্ক অর্ধেক কমবে। বাকি অর্ধেক পরের ৯ বছরে সমান ধাপে কমিয়ে দশম বছরের ১ জানুয়ারি থেকে সম্পূর্ণ শূন্য শুল্ক সুবিধা পাবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বিপুল শুল্কছাড় বাংলাদেশের কৃষি ও শিল্পপণ্যের জন্য ভয়ংকর বিপদ ডেকে আনতে পারে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং বাণিজ্য পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, শুল্কছাড় সুবিধার বেশির ভাগই গেছে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে। ২০২৫ সালের আমদানি তথ্য অনুযায়ী, যে ৬ হাজার ৭১০টি মার্কিন পণ্যে বাংলাদেশ শুল্কছাড় দিতে রাজি হয়েছে, তার মধ্যে অন্তত ২ হাজার ১৬টি ইতোমধ্যেই বাংলাদেশ আমদানি করছে। এসব পণ্যের মোট আমদানিমূল্য প্রায় ৬৫ কোটি ডলার। চুক্তি অনুযায়ী এসব পণ্যে ধাপে ধাপে শুল্ক কমানো বা প্রত্যাহার করা হলে সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হতে পারে প্রায় ৪১৯ কোটি টাকা। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের যেসব পণ্যে সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, সেগুলোর বাস্তব রপ্তানি খুবই সীমিত। ১ হাজার ৬৩৮টি পণ্যের তালিকা থেকে গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি হয়েছে মাত্র ১৪টি পণ্য। এসব পণ্যের মোট রপ্তানিমূল্য ছিল মাত্র ৬ লাখ ৭০ হাজার ডলার।
এই পণ্যগুলোতে শুল্কছাড় দিলে যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে সম্ভাব্য রাজস্ব ছাড় দিতে হতো ১ লাখ ২৫ হাজার ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় দেড় কোটি টাকা। অর্থাৎ সম্ভাব্য সুবিধা ও ক্ষতির তুলনায় দেখা যাচ্ছে—বাংলাদেশের সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতি শত কোটি টাকার হলেও যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য ছাড় কয়েক কোটি টাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
অসম বাণিজ্যচুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সরাসরি বিনিয়োগের সুযোগও খোলা রাখা হয়েছে। এই বিনিয়োগের মাধ্যমে তারা খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান, খনন, উত্তোলন, পরিশোধন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন, বিতরণ ও রপ্তানি করতে পারবে।
পাশাপাশি বাংলাদেশকে প্রাথমিকভাবে ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কিনতে হবে। এ ছাড়া আগামী ১৫ বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এবং যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট কিছু দেশের কাছ থেকে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার ওপরেও সীমা আরোপ করা হয়েছে।
ইউনূস সরকারের চুক্তির কারণে বাংলাদেশকে সাড়ে ৩ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন কৃষিপণ্য কিনতে হবে। এর মধ্যে প্রতিবছর ৭ লাখ টন হারে পাঁচ বছর ধরে গম কিনতে হবে। প্রতিবছর অন্তত ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার বা ২৬ লাখ টন সয়া ও সয়াজাত পণ্য এবং তুলা কেনার বাধ্যবাধকতাও তৈরি হয়েছে।
চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে অশুল্ক বাধা কমানোর ওপর জোর দেয়া হয়েছে। এতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এমনভাবে আমদানি লাইসেন্সিং নীতির প্রয়োগ করতে পারবে না, যাতে সেসব পণ্যের আমদানি বাধাগ্রস্ত হয়। এতদিন মার্কিন শিল্প ও চিকিৎসাপণ্য সে দেশে অনুমোদিত হলেও বাংলাদেশে রপ্তানির ক্ষেত্রে আবার পরীক্ষা ও বাজারজাত করার অনুমোদন নিতে হতো। বাণিজ্যচুক্তির ফলে এখন সরাসরি বাংলাদেশে বাজারজাত হবে এসব পণ্য।
অশুল্ক বাধা দূর করার নামে মার্কিন কৃষি ও জৈব প্রযুক্তি পণ্য বাংলাদেশে প্রবেশের ক্ষেত্রেও পরীক্ষা–নিরীক্ষা বাদ দেয়া হয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে মার্কিন স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি ব্যবস্থা এবং অন্য মানদণ্ডকে বাংলাদেশের মানদণ্ডের বিকল্প হিসেবে স্বীকৃতি পাবে। মাংস-পোলট্রি-ডিমের মতো পণ্যের ক্ষেত্রে ইউএসডিএ ফুড সেফটি অ্যান্ড ইন্সপেকশন সার্ভিসের মানদণ্ডকেই চূড়ান্ত বলে গণ্য করতে হবে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে নিরাপদ বলে স্বীকৃত বায়োটেকনোলজি বা জৈব প্রযুক্তি পণ্য বিনা পরীক্ষা ও বাড়তি কোনো লেবেলিং ছাড়াই বাংলাদেশে ঢুকতে পারবে। জেনিটিক্যালি মোডিফায়েড পণ্য আমদানিতে এখন আর বাধা দেওয়া যাবে না, এমনকি কোনো ধরনের লেবেল যুক্ত করার বিষয়ে উৎপাদক প্রতিষ্ঠানকে বাধ্য করা যাবে না।
চুক্তি অনুসারে বাংলাদেশকে খনিজ সম্পদ উত্তোলন ও রপ্তানির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগকারীদের সহযোগিতা করতে হবে। সেই সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদন, টেলিকমিউনিকেশন, পরিবহন ও অবকাঠামো খাতে দেশটির কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানের মতো সমান সুবিধা দিতে হবে। তেল-গ্যাস, বিমা ও টেলিযোগাযোগ খাতে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক বিনিয়োগের ওপর কোনো সীমা আরোপ করা যাবে না। বর্তমানে দেশি-বিদেশি বেসরকারি কোম্পানির রাষ্ট্রায়ত্ত সাধারণ বীমা করপোরেশনে ৫০ শতাংশ পুনর্বীমা করার বাধ্যবাধকতা আছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের বীমা কম্পানির ক্ষেত্রে এই নিয়ম প্রযোজ্য হবে না।
চুক্তিতে ‘রুলস অব অরিজিন’ বা পণ্যের উৎসের নিয়মসংক্রান্ত একটি ধারাও রয়েছে। এতে বলা হয়, চুক্তির সুবিধা যদি তৃতীয় কোনো দেশ বা তাদের নাগরিকদের কাছে উল্লেখযোগ্য হারে চলে যায়, তাহলে যেকোনো পক্ষ চুক্তির উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে রুলস অব অরিজিন নির্ধারণ করতে পারবে।
অর্থনীতিবিদ ও গবেষকদের বড় একটি অংশ চুক্তিটিকে ‘অসম’ এবং ‘জাতীয় স্বার্থবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে পুনর্বিবেচনা অথবা বাতিলের দাবি তুলেছেন। তারা বলছেন, এ চুক্তির ফলে চীন ও রাশিয়ার মতো দেশের সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণ বা তাদের বিনিয়োগ আকর্ষণে ভবিষ্যতে জটিলতা তৈরি হতে পারে। এ ছাড়া রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলগুলোতে (ইপিজেড) শ্রমিক ইউনিয়ন গঠনের শর্ত আরোপের কথাও বলা হয়েছে। এ ধরনের শর্ত বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তি কার্যকর করতে হলে দুই দেশের পার্লামেন্টের অনুমোদন লাগবে। তার আগে বাংলাদেশকে সংশ্লিষ্ট কিছু আইনও সংশোধন করতে হবে। তাই নতুন সরকারের উচিত আরও সময় নিয়ে চুক্তির দিশবিরোধী অংশগুলো পর্যালোচনা করা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানের চেয়ে অনেক বেশি। তাই এসব বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান সমান সুযোগ-সুবিধা পেলে দেশীয় খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পাশাপাশি দেশের সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণও খর্ব হবে। দেশে গ্যাসসংকট থাকার পরও যুক্তরাষ্ট্রের কম্পানিকে গ্যাস রপ্তানির অনুমোদন দিতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি অনুসারে বাংলাদেশ রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবাণিজ্যিক সহায়তা বা অন্য কোনো ধরনের ভর্তুকি দিতে পারবে না। এমনকি দেশের ভেতরের সব ম্যানুফ্যাকচারিং প্রতিষ্ঠানে ভর্তুকি ও প্রণোদনার তথ্য যুক্তরাষ্ট্রকে জানাতে হবে। বাজারের প্রতিযোগিতাকে প্রভাবিত করে এমন ভর্তুকিও বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কার্যকর হওয়ার ছয় মাসের মধ্যে বাংলাদেশকে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় সব ধরনের ভর্তুকির তথ্য জমা দিতে হবে।
নামে বাণিজ্যচুক্তি হলেও এর মাধ্যমে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তাব্যবস্থার সঙ্গে জড়িয়ে ফেলা হয়েছে। শর্ত অনুসারে, যুক্তরাষ্ট্র যদি জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় সীমান্ত বা বাণিজ্যিক ব্যবস্থা নেয়, তাহলে বাংলাদেশকেও তাদের সঙ্গে মিল রেখে ‘পরিপূরক বিধিনিষেধ’ গ্রহণ করতে হবে।
বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা মেনে চলার পাশাপাশি দেশটির রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আইন লঙ্ঘন ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ছাড়া তৃতীয় দেশের কাছে তথ্য পাচার ঠেকাতে বাংলাদেশের বন্দর, টার্মিনাল, লজিস্টিক নেটওয়ার্কে বিশেষ প্রযুক্তির ব্যবহার করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ক্ষতিকর হিসেবে বিবেচিত সফটওয়্যারের ব্যবহার কমিয়ে আনতে হবে।
চুক্তি পর্যালোচনার ভিত্তিতে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ তৃতীয় কোনো দেশের সঙ্গে এমন কোনো চুক্তি বা সমঝোতায় যেতে পারবে না, যার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করে বাংলাদেশ অন্য কোনো দেশের সঙ্গে কোনো ডিজিটাল বাণিজ্যচুক্তি করতে পারবে না। অর্থাৎ এই চুক্তির মাধ্যমে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের মর্যাদা হারাতে বসেছে বাংলাদেশ।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান মনে করছেন, ‘বাণিজ্য চুক্তির নামে বাংলাদেশকে কার্যত আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলা হয়েছে। এতে ভবিষ্যতে স্বাধীনভাবে সার্বভৌম সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে।’
সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘ অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা বাণিজ্যচুক্তি চরমভাবে বৈষম্যমূলক এবং দেশের অর্থনৈতিক স্বাধীনতার জন্য বড় হুমকি। চুক্তির শর্ত দেখে আমরা হতভম্ব, স্তম্ভিত। সরকারের উচিত এই চুক্তি থেকে সরে আসা।’
খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে শুল্ক সংক্রান্ত আলোচনা শুরু হলেও সাধারণ মানুষকে ধারণা দেওয়া হয়েছিল, বিষয়টি শুধু পাল্টা শুল্ক কমানোর (৩৫ থেকে ২০ শতাংশ) পর্যায়ে সীমাবদ্ধ। তবে বাস্তবে চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত শর্তগুলো অনেক বেশি জটিল ও একপক্ষীয়। কিভাবে একটি অনির্বাচিত সরকার এই চুক্তি করতে পারল এবং এটি নির্বাচিত সরকারের কাঁধে এলো, তা বোধগম্য নয়।’
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. মাসরুর রিয়াজ বলেন, ‘চুক্তির কিছু শর্ত বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণী স্বাধীনতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। বিশেষ করে প্রতিরক্ষা কেনাকাটা বা অন্য দেশের সঙ্গে ভবিষ্যৎ বাণিজ্যচুক্তির ক্ষেত্রে এর প্রভাব পড়তে পারে।’
