ইউরোপে পোশাক রপ্তানি বেশি কমেছে বাংলাদেশের

ইউরোপে পোশাক রপ্তানি বেশি কমেছে বাংলাদেশের

বাংলাদেশ

ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার। তবে চলতি বছরের প্রথম চার মাসে এই বাজারে দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। এ সময়ে ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি প্রায় ১৯ শতাংশ কমেছে, যা প্রতিযোগী দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। রপ্তানিকারকরা বলছেন, চীনের আগ্রাসী মূল্যছাড়, ভারতের সঙ্গে ইইউর মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ), বৈশ্বিক চাহিদা হ্রাস এবং সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির প্রভাব মিলিয়ে বাংলাদেশের রপ্তানি কমে গেছে।

১৯ শতাংশ কমেছে রপ্তানি ইউরোস্ট্যাটের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ইইউ বিভিন্ন দেশ থেকে মোট ২ হাজার ৭৭৭ কোটি ইউরোর তৈরি পোশাক আমদানি করেছে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এই আমদানি কমেছে ১০ দশমিক ৪২ শতাংশ। একই সময়ে বাংলাদেশ ইইউতে ৬০৯ কোটি ইউরোর তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। গত বছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ৭৫৪ কোটি ইউরো। অর্থাৎ, রপ্তানি কমেছে ১৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ।

চীনের আগ্রাসী প্রতিযোগিতা বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতির পরিবর্তনের পর চীনের পোশাক রপ্তানিকারকরা ইউরোপীয় বাজারে আরও আগ্রাসীভাবে প্রবেশ করেছে। সরকারি সহায়তায় কম দামে ক্রয়াদেশ নেওয়ায় অনেক অর্ডার বাংলাদেশ থেকে চীনে চলে যাচ্ছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম চার মাসে চীন ইইউতে ৭৯৫ কোটি ইউরোর পোশাক রপ্তানি করেছে। তাদের রপ্তানি কমেছে মাত্র ৪ দশমিক ৭ শতাংশ, যা ইইউর সামগ্রিক আমদানি হ্রাসের চেয়েও কম।

ভারতের দিকেও ঝুঁকছে ক্রেতারা তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর সহসভাপতি মো. শিহাব উদ্দোজা চৌধুরী বলেন, তিনটি কারণে বাংলাদেশের রপ্তানি কমছে। প্রথমত, ইউরোপে ভোক্তা পর্যায়ে পোশাকের চাহিদা কমেছে। দ্বিতীয়ত, চীন মূল্যছাড় দিয়ে বাজার দখলের চেষ্টা করছে। তৃতীয়ত, ভারতের সঙ্গে ইইউর এফটিএ কার্যকর হওয়ায় অনেক ক্রেতা ভারতমুখী হচ্ছে।

তার মতে, আগামী এক বছরে ভারতের দিকে ক্রয়াদেশ স্থানান্তরের প্রবণতা আরও বাড়তে পারে। রপ্তানি মূল্যে পিছিয়ে বাংলাদেশ ইইউ বাজারে বাংলাদেশ পরিমাণের দিক থেকে চীনের চেয়ে বেশি পোশাক রপ্তানি করলেও মূল্যমানের দিক থেকে অনেক পিছিয়ে রয়েছে।

চলতি বছরের প্রথম চার মাসে বাংলাদেশ ৪৪ কোটি কেজি পোশাক রপ্তানি করেছে, যেখানে চীন রপ্তানি করেছে ৪১ কোটি কেজি। তবে প্রতি কেজি পোশাকের গড় রপ্তানি মূল্য বাংলাদেশে ছিল ১৩ দশমিক ৯৬ ইউরো, আর চীনের ক্ষেত্রে ছিল ১৯ দশমিক ৪৪ ইউরো।

শিল্পমালিকদের উদ্বেগ বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলেন, চীন যখন রপ্তানি বাড়াতে রাষ্ট্রীয় সহায়তা পাচ্ছে, তখন বাংলাদেশে ব্যবসার ব্যয় বেড়েছে এবং সরকারি সহায়তা কমেছে। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতের সংকটের কারণে অনেক কারখানা প্রয়োজনীয় অর্থায়ন পাচ্ছে না। ফলে কিছু কারখানা উৎপাদন ও রপ্তানি কমিয়েছে, আবার কিছু কারখানা বন্ধও হয়ে গেছে।

ইইউ এখনো সবচেয়ে বড় বাজার রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে বাংলাদেশ ৩ হাজার ৫৩১ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। এর মধ্যে প্রায় ৪৯ শতাংশ বা ১ হাজার ৭৩৬ কোটি ডলারের পোশাক গেছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে। তবে এই সময়ে ইইউতে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রায় ৫ শতাংশ কমেছে।

উদ্যোক্তাদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে উৎপাদন ব্যয় কমানো, অর্থায়ন সহজ করা এবং নতুন বাণিজ্য সুবিধা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।