স্মার্টফোনের পর প্রযুক্তি দুনিয়ায় নতুন ধরনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর ডিভাইসের ব্যবহার বাড়ছে। স্মার্ট চশমা, এআই পিন, পেনডেন্ট ও ছোট রেকর্ডারের মতো এসব যন্ত্র ব্যবহারকারীর চারপাশের পরিস্থিতি বুঝে বিভিন্ন কাজে সহায়তা করতে পারে। তবে ডিভাইসগুলো যত বেশি তথ্য সংগ্রহ করছে, ততই বাড়ছে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে উদ্বেগ।
বিশেষ করে ক্যামেরা ও মাইক্রোফোনযুক্ত স্মার্ট চশমা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে বেশি। কারণ ব্যবহারকারীর আশপাশে থাকা মানুষ সবসময় বুঝতে নাও পারেন যে তাঁদের ছবি, ভিডিও বা কথোপকথন ধারণ করা হচ্ছে। এ কারণে যুক্তরাজ্যের কয়েকটি স্থানে স্মার্ট চশমার ব্যবহার সীমিত করা হয়েছে। দেশটির বড় পাব চেইন ওয়েদারস্পুনও এমন পদক্ষেপ নিয়েছে।
### মেটার স্মার্ট চশমা নিয়ে বিতর্ক
এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে মেটার রে-ব্যান স্মার্ট চশমা। ক্যামেরা ও মাইক্রোফোনযুক্ত এই চশমা নিয়ে গোপন রেকর্ডিংয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। মেটার বিরুদ্ধে করা একটি মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, চশমায় ধারণ করা কিছু ভিডিও এআই প্রশিক্ষণের কাজে ব্যবহারের জন্য কর্মীরা দেখেছেন ও শ্রেণিবদ্ধ করেছেন। এসব ভিডিওতে ব্যক্তিগত মুহূর্ত ধারণ হওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
তবে মেটা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, চশমায় ভিডিও ধারণের সময় একটি আলো জ্বলে, যা বন্ধ করা যায় না। আলো ঢেকে দেওয়া বা এতে কারসাজি করা হলে ক্যামেরা কাজ বন্ধ করে দেয়।
### স্মার্ট চশমার বাজারে আসছে স্যামসাং
গোপনীয়তা নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই স্মার্ট চশমার বাজারে প্রবেশের পরিকল্পনা করছে স্যামসাং। জেন্টল মনস্টার ও ওয়ারবি পার্কারের সঙ্গে অংশীদারির মাধ্যমে চলতি বছরের শেষ দিকে ডিভাইসটি বাজারে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
স্যামসাংয়ের মোবাইল বিভাগের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট জে কিম বলেন, ভবিষ্যতের সফল ডিভাইসকে শুধু ব্যবহারবান্ধব হলেই হবে না, মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্যও হতে হবে। প্রতিষ্ঠানটি স্মার্ট চশমাকে স্মার্টফোনের সরাসরি বিকল্প হিসেবে দেখছে না।
### ক্যামেরাবিহীন চশমার দিকে ঝুঁকছে কিছু প্রতিষ্ঠান
গোপনীয়তার উদ্বেগের কারণে কিছু প্রতিষ্ঠান ক্যামেরাবিহীন স্মার্ট চশমা তৈরির দিকে যাচ্ছে। শেনঝেনভিত্তিক ইভেন রিয়েলিটিজ ২০২৪ সালে ক্যামেরাবিহীন জি১ স্মার্ট চশমা বাজারে আনে। প্রতিষ্ঠানটির সর্বশেষ মডেল জি২ বাজারে আসে ২০২৫ সালের নভেম্বরে।
প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা উইল ওয়াং বলেন, অনেক ক্রেতা এখন স্মার্ট চশমাকে গোপন রেকর্ডিংয়ের সঙ্গে যুক্ত করে দেখছেন। তাই শক্তিশালী নিরাপত্তা ব্যবস্থা তৈরি না হওয়া পর্যন্ত ক্যামেরা ব্যবহারে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
এআই রেকর্ডারের ক্ষেত্রেও গোপনীয়তার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। পকেটের তৈরি একটি রেকর্ডারে ধারণ করতে ব্যবহারকারীকে বোতাম চাপতে হয়। অন্যদিকে প্লাউডের কিছু ডিভাইসে আলো বা শব্দের মাধ্যমে আশপাশের মানুষকে রেকর্ডিং শুরুর বিষয়টি জানানো হয়।
### তথ্য যত বেশি সংগ্রহ, গোপনীয়তার প্রশ্নও তত বেশি
এআই ডিভাইসের বড় সুবিধা হলো ব্যবহারকারীর চারপাশের পরিস্থিতি বুঝে প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা করা। কিন্তু এ কাজের জন্য ডিভাইসকে বিপুল পরিমাণ তথ্য সংগ্রহ করতে হয়। এর মধ্যে এমন মানুষের ছবি, ভিডিও বা কথোপকথনও থাকতে পারে, যারা রেকর্ডিংয়ের জন্য কোনো সম্মতি দেননি।
ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যানও ডিভাইসের ভেতরেই তথ্য প্রক্রিয়াকরণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, কোনো ডিভাইস যদি সারাক্ষণ মানুষের জীবন সম্পর্কে শুনতে ও দেখতে থাকে, তাহলে সেই তথ্য নিয়মিত ক্লাউড সার্ভারে পাঠানো নিয়ে ব্যবহারকারীদের উদ্বেগ তৈরি হতে পারে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইডিসির পরিচালক জিতেশ উবরানির মতে, মানুষ রেকর্ডিংয়ের পুরোপুরি বিরোধী নয়; তারা মূলত জানতে চান কখন, কীভাবে এবং কোন উদ্দেশ্যে তাঁদের রেকর্ড করা হচ্ছে এবং এ বিষয়ে তাঁদের সম্মতি রয়েছে কি না।
ফলে স্মার্ট চশমা ও অন্যান্য এআই ডিভাইসের ভবিষ্যৎ শুধু প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ওপর নির্ভর করছে না। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, স্বচ্ছতা এবং ব্যবহারকারীর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করাও এসব ডিভাইসের গ্রহণযোগ্যতার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠছে।
