গত কয়েক মাসে সমুদ্রে বেসামরিক নাবিকদের লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে ২০ জনের বেশি মানুষকে হত্যা করেছে ইরান। একই সময়ে উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রতিবেশী দেশগুলোর বেসামরিক অবকাঠামো, আবাসিক এলাকা ও বিভিন্ন স্থাপনাতেও হামলা চালিয়েছে তেহরান। সোমবার (২ নভেম্বর) এমন অভিযোগ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি প্রতিবেশী দেশগুলোর বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলার অভিযোগ অস্বীকার করার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ বিবৃতি দেয় মার্কিন সামরিক বাহিনীর মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক কমান্ড। তেহরান কখনোই প্রতিবেশী দেশগুলোতে বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়নি—আরাঘচির এমন বক্তব্যকে ‘মিথ্যা’ বলে উল্লেখ করেছে সেন্টকম।
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘ইরানের নির্বিচার আগ্রাসন স্পষ্ট এবং কোনোভাবেই ক্ষমাযোগ্য নয়।’
তবে ২০ জনের বেশি নাবিক নিহত হওয়ার দাবির পক্ষে নির্দিষ্ট কোনো ঘটনার বিবরণ, জাহাজের নাম কিংবা হতাহতের সংখ্যা নির্ধারণের পদ্ধতি তুলে ধরেনি সেন্টকম।
- বেসামরিক স্থাপনায় হামলার অভিযোগ অস্বীকার ইরানের
যুদ্ধের পুরো সময়জুড়েই বেসামরিক স্থাপনায় হামলার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি।
গত মার্চে আল-আরাবি আল-জাদিদকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ইরান কোনো আবাসিক বা বেসামরিক স্থাপনায় হামলা চালায়নি। কোন কোন স্থানে হামলা হয়েছে, তা যাচাই করতে উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে যৌথ তদন্ত কমিটি গঠনের প্রস্তাবও দিয়েছিলেন তিনি। আরাঘচির দাবি, ইরান আরব দেশগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে না; বরং এসব দেশে থাকা মার্কিন ঘাঁটি ও স্থাপনাকে লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে। তবে মাঝেমধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র ভুল লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
- নাবিক নিহতের পরিসংখ্যানে আইএমওর হিসাব
আন্তর্জাতিক নৌ-সংস্থা (আইএমও) এখন পর্যন্ত এমন কোনো পরিসংখ্যান প্রকাশ করেনি, যা সেন্টকমের দাবির সঙ্গে সরাসরি মেলে। বার্তা সংস্থা এএফপির ২৫ আগস্টের এক প্রতিবেদনে আইএমওর সর্বশেষ প্রকাশিত হিসাব তুলে ধরা হয়। তাতে বলা হয়, ছয় মাসের যুদ্ধ চলাকালে হরমুজ প্রণালি ও এর আশপাশে ৬৮টি ঘটনায় অন্তত ২০ জন নাবিক ও বন্দরকর্মী নিহত, ৩৫ জন আহত এবং একজন নিখোঁজ হয়েছেন।
তবে এসব ঘটনায় কারা দায়ী, তা নির্দিষ্ট করেনি আইএমও।
যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) কেন্দ্রের শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী, ওই ৬৮টি ঘটনার মধ্যে ৪৭টিকে হামলা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ইউএসএনআই নিউজ জানিয়েছে, আইএমওর এই হিসাবের মধ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র—উভয় পক্ষের হামলার ঘটনাই অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর আগে গত মে মাসে আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে আইএমওর বরাত দিয়ে বলা হয়েছিল, উপসাগরীয় অঞ্চল ও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে ইরানের হামলায় অন্তত ১০ জন নাবিক নিহত হয়েছেন।
অন্যদিকে, ইরানের বণিক নাবিক ইউনিয়ন আলজাজিরাকে জানিয়েছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১ এপ্রিলের মধ্যে ইরানের বন্দর ও জাহাজে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় দেশটির অন্তত ৪৪ জন নাবিক, জেলে ও ডককর্মী নিহত হয়েছেন।
- উপসাগরীয় দেশগুলোরও ইরানের বিরুদ্ধে অভিযোগ
উপসাগরীয় দেশগুলোও ইরানের বিরুদ্ধে জ্বালানি অবকাঠামো ও আবাসিক এলাকায় হামলার অভিযোগ তুলেছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, এসব হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোর বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে তেহরানকে হামলা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে উপসাগরীয় দেশগুলো।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের কূটনৈতিক উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ বলেছেন, ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের ব্যাপকতা দেশটির কেবল মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার দাবির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
গত মে মাসে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বেসামরিক নাগরিক ও অর্থনৈতিক স্থাপনার পাশাপাশি দেশটির একটি প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন তেলবাহী জাহাজে হামলার নিন্দা জানিয়েছিল সৌদি আরব।
এদিকে, গত মার্চে উপসাগরীয় দেশগুলোতে আঘাত হানা হামলার ঘটনায় রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত বক্তব্যে ক্ষমা চেয়েছিলেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তবে কট্টরপন্থিদের সমালোচনার মুখে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেই বক্তব্য প্রত্যাহার করেন তিনি। গালফ কান্ট্রিজ মিডিয়ার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
- সৌদি বন্দরের কাছে তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা
সমুদ্রপথে জাহাজে হামলার ঘটনাও অব্যাহত রয়েছে। রোববার সৌদি আরবের রাস আল-খাফজি বন্দরের কাছে একটি তেলবাহী ট্যাংকার হামলার শিকার হয়েছে বলে ইউকেএমটিওর প্রকাশিত মানচিত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এ ঘটনায় কারা হামলা চালিয়েছে, তা পর্যালোচনা করা সূত্রগুলোতে উল্লেখ করা হয়নি।
ইরানে আবারও সামরিক হামলার পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র?
এমন পরিস্থিতির মধ্যেই মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে আবারও সামরিক হামলা শুরু করা যায় কি না, তা বিবেচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। উপসাগরীয় দেশগুলোর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী ৪ নভেম্বরের মধ্যেই সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের বিষয়ে ওয়াশিংটন তাদের সতর্ক করেছে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনা, সমুদ্রপথে জাহাজে হামলা এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
