যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কি সত্যিই আর ১৪ দিন চলার মতো তেল আছে?

যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কি সত্যিই আর ১৪ দিন চলার মতো তেল আছে?

আন্তর্জাতিক

যুক্তরাষ্ট্রে আর মাত্র ১৪ দিনের তেল মজুত রয়েছে—সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন একটি দাবি ছড়িয়ে পড়েছে। এ নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনা তৈরি হলেও দাবিটির পেছনে যে হিসাব দেখানো হচ্ছে, তা বিভ্রান্তিকর। তবে ভাইরাল দাবির আড়ালে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে বাস্তব একটি উদ্বেগ রয়েছে।

ভাইরাল হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুতে রয়েছে ২৮৬ দশমিক ৬ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল। দেশটি প্রতিদিন প্রায় ২০ দশমিক ৭ মিলিয়ন ব্যারেল জ্বালানি ব্যবহার করে। এই দুই সংখ্যাকে ভাগ করেই বলা হচ্ছে, মজুত দিয়ে মাত্র ১৪ দিন চলতে পারবে যুক্তরাষ্ট্র।

তবে এই হিসাব সঠিক নয়। কারণ কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুত হলো সরকারের জরুরি резерв, যা স্বাভাবিক সময়ে দেশের দৈনন্দিন জ্বালানি ব্যবহারের একমাত্র উৎস নয়। একইভাবে দৈনিক জ্বালানি ব্যবহারের পরিমাণ এবং অপরিশোধিত তেলের মজুতকে সরাসরি তুলনা করাও সঠিক পদ্ধতি নয়।

যুক্তরাষ্ট্র নিজেই বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল উৎপাদন করে। পাশাপাশি দেশটির বাণিজ্যিক মজুতেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল রয়েছে। দেশটির শোধনাগারগুলো প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করে এবং আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তেল আমদানি ও রপ্তানিও অব্যাহত থাকে। ফলে কৌশলগত মজুতকে দৈনিক মোট জ্বালানি ব্যবহারের সঙ্গে ভাগ করে ‘১৪ দিন পর তেল শেষ’—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।

তবে উদ্বেগের জায়গাটি অন্যত্র। যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুত বর্তমানে বহু বছরের মধ্যে অত্যন্ত নিচু পর্যায়ে রয়েছে। ১৯৭৩-৭৪ সালের আরব তেল অবরোধের পর ১৯৭৫ সালে জরুরি পরিস্থিতিতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে এই মজুত ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়। মেক্সিকো উপসাগরীয় অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ লবণগুহায় এই বিপুল মজুত সংরক্ষণ করা হয়।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংকট মোকাবিলায় এই মজুত থেকে বড় পরিমাণ তেল বাজারে ছাড়া হয়েছে। ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দিলে তৎকালীন মার্কিন প্রশাসন কৌশলগত মজুত থেকে বিপুল পরিমাণ তেল ছাড়ে। এতে বাজারে সরবরাহ বাড়লেও সরকারি জরুরি মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।

পরবর্তী সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থায় ঝুঁকি বাড়ার কারণে মজুত ব্যবহারের চাপ আরও বেড়েছে। ফলে বর্তমানে জরুরি পরিস্থিতিতে বাজারে সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে আগের তুলনায় কম মজুত রয়েছে।

অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রে আগামী ১৪ দিনের মধ্যে তেল শেষ হয়ে যাওয়ার দাবি বাস্তবসম্মত নয়। তবে কৌশলগত মজুতের পরিমাণ দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সংকট, যুদ্ধ, সমুদ্রপথে অবরোধ বা বড় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষেত্রে দেশটির সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে।

বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথে বড় ধরনের সংকট দেখা দিলে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ ব্যাহত হয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম দ্রুত বাড়তে পারে। একই সঙ্গে জরুরি মজুত থেকে বিপুল পরিমাণ তেল ব্যবহার করার পর তা পুনরায় পূরণ করাও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় আর্থিক ও কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।