ইরানের সঙ্গে কয়েক মাসের সরাসরি সংঘাতে আকাশ, সমুদ্র ও স্থলপথে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। যুদ্ধবিমান, যুদ্ধজাহাজ, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ ব্যবহারের পর এই অভিযানের আর্থিক মূল্যও দাঁড়িয়েছে বিশাল অঙ্কে।
মার্কিন সরকারের মহাপরিদর্শকের কার্যালয়ের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি অভিযান শুরুর পর ৩০ জুন পর্যন্ত ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র আনুমানিক সামরিক ব্যয় হয়েছে ৩৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। তবে এটিই চূড়ান্ত ব্যয় নয়। অবকাঠামো মেরামত, ভবিষ্যৎ পুনর্গঠন এবং যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রভাব এতে ধরা হয়নি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যবহৃত গোলাবারুদের মূল্য প্রায় ২২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। অতিরিক্ত পরিচালন ব্যয় ৭ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার এবং ক্ষতিগ্রস্ত বা হারানো সামরিক সরঞ্জাম প্রতিস্থাপনে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার।
নিয়মিত সামরিক বাজেট থেকেই যুদ্ধের ব্যয় ২০২৬ অর্থবছরে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র জন্য কংগ্রেস আলাদা কোনো অর্থ বরাদ্দ করেনি। ফলে নিয়মিত সামরিক বাজেট থেকেই যুদ্ধ পরিচালনার অর্থ জোগানো হয়েছে।
৩০ জুন পর্যন্ত প্রায় ৭ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের ব্যয় বাধ্যতামূলক হিসেবে নির্ধারিত ছিল। এর প্রায় ৯০ শতাংশই ছিল পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতে। এর মধ্যে সামরিক অভিযান, সেনাদের সহায়তা এবং সরঞ্জাম রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় অন্তর্ভুক্ত।
ইতোমধ্যে প্রায় ৪ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করা হয়েছে। এটি মোট বাধ্যতামূলক ব্যয়ের প্রায় ৬৫ শতাংশ।
সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয়েছে বিমান পরিবহন অভিযানে, প্রায় ৯২৯ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলার। উড্ডয়ন কার্যক্রমে ৬৯১ দশমিক ১ মিলিয়ন, জাহাজ পরিচালনায় ৬৪৭ দশমিক ৭ মিলিয়ন, ঘাঁটি সহায়তায় ৪০৫ মিলিয়ন এবং সামরিক ইউনিট পরিচালনায় ৩৮৫ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে।
আরও ৬৭.১ বিলিয়ন ডলার চেয়েছে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের ব্যয় মেটাতে মার্কিন প্রশাসন কংগ্রেসের কাছে অতিরিক্ত ৮৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার চেয়েছে। এর মধ্যে প্রতিরক্ষা বিভাগের জন্য চাওয়া হয়েছে ৬৭ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার।
এই অর্থের মধ্যে ২১ বিলিয়ন ডলার গোলাবারুদ, ১৭ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার পরিচালন ব্যয়, ১২ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার গোপনীয় কর্মসূচি, ৫ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার সাইবার নিরাপত্তা ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা, ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার ড্রোন, ১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার সামরিক সরঞ্জাম এবং ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার জ্বালানির জন্য চাওয়া হয়েছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী সতর্ক করেছেন, অতিরিক্ত অর্থ না পাওয়া গেলে সেনাদের বেতন, ব্যবহৃত অস্ত্র ও সরঞ্জামের মজুত পুনর্গঠন এবং বিশ্বজুড়ে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
গোলাবারুদে ২২.৩ বিলিয়ন ডলারের চাপ যুদ্ধের সবচেয়ে বড় আর্থিক চাপ এসেছে গোলাবারুদ ব্যবহারে। ৩০ জুন পর্যন্ত প্রায় ২২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের গোলাবারুদ ব্যবহার করা হয়েছে। এই অর্থ মূলত ব্যবহৃত গোলাবারুদ পুনরায় সংগ্রহ করতে প্রয়োজন হবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিপুল গোলাবারুদ ব্যবহারের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রের কৌশলগত মজুত কমে গেছে। পাশাপাশি প্রতিরক্ষা শিল্পেও সরবরাহ ও উৎপাদন সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে রকেট মোটর, উচ্চমানের বিস্ফোরক, বিস্ফোরক তৈরির উপাদান এবং দক্ষ কর্মীর ঘাটতিকে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ফলে শুধু অর্থ বরাদ্দ করলেই দ্রুত আগের অবস্থায় ফেরা সম্ভব হবে না; অস্ত্র উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়াতেও সময় লাগবে।
যুদ্ধে কত সামরিক বিমান হারিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র? প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইরানের সঙ্গে সংঘাত ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কিছু বিমান ও ড্রোন ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এফ-১৫ই যুদ্ধবিমান চারটি হারিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্যে তিনটি নিজেদের বাহিনীর গুলিতে এবং একটি শত্রুর হামলায় ধ্বংস হয়েছে। একটি এফ-৩৫এ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ-১০ যুদ্ধবিমান একটি হারিয়েছে। পাশাপাশি সাতটি কেসি-১৩৫, একটি ই-৩ এবং একটি এইচএইচ-৬০ হেলিকপ্টার ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।
এ ছাড়া একটি এমকিউ-৪সি, চারটি এএইচ-৬ এবং একটি এএইচ-৬৪ হেলিকপ্টার হারিয়েছে মার্কিন বাহিনী। আর বিভিন্ন ঘটনায় ৩০টি পর্যন্ত এমকিউ-৯ ড্রোন ধ্বংস হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সামরিক ঘাঁটিতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি
ইরানি হামলায় কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, ইরাক, ওমান ও জর্ডানে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটির বহু ভবন ও স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।
এ ছাড়া ইরাক, কুয়েত, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে থাকা মার্কিন কূটনৈতিক স্থাপনাগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব ক্ষয়ক্ষতির আনুমানিক মূল্য ১৮৪ মিলিয়ন ডলার বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
৪১৭ জন আহত, নিহত ১৪
২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত হিসাবে সাতজন মার্কিন সেনা যুদ্ধে নিহত হয়েছেন। একই সময়ে যুদ্ধের বাইরে বিভিন্ন ঘটনায় আরও সাতজন সেনা নিহত হন। এ সময়ে ৪১৭ জন আহত হয়েছেন।
তবে জুলাই মাসে আরও কয়েকজন মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার তথ্য প্রতিবেদনে আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে ৫০ হাজারের বেশি সেনা মোতায়েন অভিযান পরিচালনায় যুক্তরাষ্ট্রকে বিপুলসংখ্যক সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম মধ্যপ্রাচ্যে পাঠাতে হয়েছে। ৩০ জুন পর্যন্ত ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডের আওতাধীন এলাকায় ৫০ হাজারের বেশি মার্কিন সেনা মোতায়েন ছিল।
এ সময়ে মার্কিন পরিবহন কমান্ড ১ হাজার ৫০০টির বেশি বিমান মিশন পরিচালনা করেছে। যুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০টি বিমান মিশন সরাসরি ওই অঞ্চলে পরিচালিত হয়েছে।
সামরিক সরঞ্জাম পরিবহনে প্রায় ৩ লাখ বর্গফুট কার্গো স্থানান্তর করা হয়েছে। বাণিজ্যিক কার্গোর পরিমাণ মাসে ৯ হাজার কেস থেকে বেড়ে ৭৪ হাজার কেসে পৌঁছায়, যা প্রায় ৭২২ শতাংশ বৃদ্ধি।
এ ছাড়া সামরিক পরিবহন-সংশ্লিষ্ট তহবিলে প্রায় ২ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলারের বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে।
যুদ্ধের মধ্যেই মিত্রদের কাছে ৪৪.৫১ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র ইরানের সঙ্গে সংঘাতের সময় নিজেদের অস্ত্র ব্যবহারের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের কাছেও বিপুল অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত মোট ৪৪ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রির তথ্য প্রতিবেদনে রয়েছে। এর মধ্যে জরুরি ভিত্তিতে ২৫ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দেওয়া হয়। আরও ১৯ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলারের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অস্ত্র বিক্রির পরিকল্পনা ছিল।
দেশভিত্তিক হিসাবে সৌদি আরবের কাছে ১২ বিলিয়ন, কুয়েতের কাছে ১০ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের কাছে ৮ দশমিক ৬১ বিলিয়ন, ইসরায়েলের কাছে ৭ দশমিক ৮১ বিলিয়ন, কাতারের কাছে ৫ বিলিয়ন এবং জর্ডানের কাছে ৩৫০ মিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রির তথ্য রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধের প্রয়োজন মেটাতে কিছু মিত্রের আগে কেনা প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহও বিলম্বিত বা আটকে রাখা হয়েছিল।
ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে এখন দ্বৈত চাপ তৈরি হয়েছে। একদিকে যুদ্ধের কারণে নিজস্ব অস্ত্রের মজুত কমেছে, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বজায় রাখতে অস্ত্র সরবরাহের চাপও রয়েছে।
কূটনৈতিক ও নাগরিক ব্যয়ও বেড়েছে যুদ্ধের ব্যয় শুধু সামরিক খাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ২ জুন পর্যন্ত মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর সংঘাত-সংশ্লিষ্ট কাজে ১১৩ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে।
এর মধ্যে ৭৯ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে মার্কিন কূটনীতিক, তাদের পরিবার, মার্কিন নাগরিক এবং যোগ্য তৃতীয় দেশের নাগরিকদের জরুরি ভিত্তিতে সরিয়ে নিতে।
সংঘাতের পর মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রায় ৯ হাজার মার্কিন নাগরিকের প্রস্থানের ব্যবস্থা করেছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর। এ জন্য ৫৬টি ফ্লাইট পরিচালনা করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে ইরানের সঙ্গে কয়েক মাসের সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের জন্য শুধু সামরিক ক্ষয়ক্ষতিই নয়, বরং বিপুল আর্থিক চাপও তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞদের জন্য এখন বড় প্রশ্ন হলো—ব্যবহৃত অস্ত্রের মজুত আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে কত সময় ও অর্থ প্রয়োজন হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে এই যুদ্ধের প্রকৃত ব্যয় কত দাঁড়াবে।
