পাঁচ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ জ্বালানি তেলের দাম, পেছনে কী কারণ?

পাঁচ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ জ্বালানি তেলের দাম, পেছনে কী কারণ?

অর্থনীতি আন্তর্জাতিক

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের বিস্তার এবং সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়েছে। শুক্রবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৩ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৯ দশমিক ৮৬ ডলারে পৌঁছেছে। লেনদেনের একপর্যায়ে দাম ১১০ ডলার ছাড়িয়ে যায়, যা গত পাঁচ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছাকাছি।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেল ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দামও বেড়েছে। এক মাসের মধ্যে প্রথমবারের মতো এ তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার অতিক্রম করে। দিন শেষে ডব্লিউটিআইয়ের দাম ৩ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ১০১ দশমিক ৪১ ডলারে দাঁড়ায়। ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়া এবং সৌদি আরবের তেল রপ্তানি অবকাঠামোতে হামলার ঝুঁকি বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে। এর ফলে তেলের দাম আরও বাড়ার চাপ তৈরি হতে পারে।

## মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে অস্থির জ্বালানি বাজার

ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাত শুরুর পর থেকেই আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা চলছে। যুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়। পরে যুদ্ধবিরতির খবরে দাম কমলেও মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ পুরোপুরি কাটেনি।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের মে মাসে ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারসের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১১ ডলারের ওপরে উঠেছিল। পরবর্তী সময়ে যুদ্ধবিরতি এবং সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার প্রত্যাশায় জুনের শেষ দিকে দাম কমে প্রায় ৭৩ ডলারে নেমে আসে।

তবে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ায় জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা আবারও বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামে।

বিশ্লেষকদের মতে, তেলের বাজারে শুধু উৎপাদন ও চাহিদাই নয়, ভূরাজনৈতিক ঝুঁকিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সরবরাহপথে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা তৈরি হলে বাস্তবে সরবরাহ কমার আগেই দাম বেড়ে যেতে পারে।

## সৌদি আরবের বিকল্প রপ্তানি পথও ঝুঁকিতে

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠায় সৌদি আরবের জন্য লোহিত সাগর উপকূলের ইয়ানবু বন্দরের গুরুত্ব বেড়েছে। দেশটির পূর্বাঞ্চল থেকে ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের মাধ্যমে অপরিশোধিত তেল ইয়ানবুতে নেওয়া হয়। সেখান থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল রপ্তানি করা সম্ভব।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুক্রবার সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ইয়ানবুর দিকে ছোড়া একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার দাবি করেছে। ইয়ানবু সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিশোধন ও পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পকেন্দ্রগুলোর একটি।

জ্বালানিবিষয়ক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান রিস্টাড এনার্জির বিশ্লেষক শ্রেইনার পার্কার ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেছেন, ইয়ানবুকে লক্ষ্য করে হামলার আশঙ্কা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। কারণ, সৌদি আরবের অপরিশোধিত তেল রপ্তানির ক্ষেত্রে বন্দরটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

হরমুজ প্রণালিতে ট্যাংকার চলাচলে ঝুঁকি বাড়লে ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন সৌদি আরবের বিকল্প পরিবহনপথ হিসেবে কাজ করে। কিন্তু ইয়ানবু বন্দরেও হামলার ঝুঁকি তৈরি হলে বিকল্প পথে তেল রপ্তানি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়তে পারে।

## হরমুজ প্রণালি নিয়ে কেন এত উদ্বেগ?

বিশ্বের জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য হরমুজ প্রণালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সমুদ্রপথ। এই পথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেল ও অন্যান্য জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।

এ ছাড়া নিরাপত্তাঝুঁকি বাড়লে জাহাজের পরিবহন ব্যয়, যুদ্ধঝুঁকির বিমা এবং বিকল্প পথে পণ্য পরিবহনের খরচও বেড়ে যেতে পারে। এসব অতিরিক্ত ব্যয় শেষ পর্যন্ত তেলের আন্তর্জাতিক দামে প্রভাব ফেলতে পারে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলার ঘটনা এবং ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের সৌদি আরবে হামলার কারণে উদ্বেগ বেড়েছে। সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি সৌদি আরামকোর স্থাপনাগুলোকে ঘিরেও নিরাপত্তা উদ্বেগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

## তেলের দাম আরও বাড়বে কি?

বিশ্ববাজারে তেলের দাম কোন দিকে যাবে, তা অনেকটাই নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল এবং সৌদি আরবের রপ্তানি অবকাঠামোর নিরাপত্তার ওপর।

তেল উৎপাদন অব্যাহত থাকলেও পরিবহনপথ ঝুঁকির মুখে পড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি ও ইয়ানবু বন্দরে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে বাজারে সরবরাহের চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তবে তেলের দাম কতটা বাড়বে, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। সংঘাতের গতিপ্রকৃতি, সরবরাহ পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে পরবর্তী মূল্য পরিবর্তন।