কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশ নিয়ে বিশ্বজুড়ে যখন প্রযুক্তি খাত এগিয়ে চলেছে, তখন এর সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় কঠোর নিয়ন্ত্রণের দাবি উঠেছে যুক্তরাষ্ট্রে। মানুষের বুদ্ধিমত্তাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে—এমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরি ও ব্যবহারে স্থায়ী নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাব দিয়েছেন দেশটির কয়েকজন আইনপ্রণেতা। পাশাপাশি আরও উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরির কার্যক্রমে সাময়িক বিরতিরও দাবি জানানো হয়েছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এই উদ্যোগের নেতৃত্বে রয়েছেন মার্কিন সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স ও প্রতিনিধি গ্রেগ কাসার। তারা ‘ব্যান আর্টিফিশিয়াল সুপারইনটেলিজেন্স অ্যাক্ট’ নামে একটি বিল প্রস্তাব করেছেন। এর লক্ষ্য হলো এমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশ ঠেকানো, যা মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতাকে ছাড়িয়ে গিয়ে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে এবং একপর্যায়ে মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
উন্নত এআই তৈরিতে সাময়িক বিরতির দাবি বার্নি স্যান্ডার্সের মতে, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত আরও শক্তিশালী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরি করছে। কিন্তু এসব প্রযুক্তি ভবিষ্যতে কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, তা এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি।
তাই কার্যকর নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি না হওয়া পর্যন্ত উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নয়ন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
একই সঙ্গে মানুষের চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরিতে স্থায়ী নিষেধাজ্ঞারও আহ্বান জানিয়েছেন স্যান্ডার্স। প্রস্তাবিত আইনে যুক্তরাষ্ট্রকে অন্যান্য দেশের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করার কথা বলা হয়েছে, যাতে কোনো দেশ এককভাবে এ ধরনের প্রযুক্তি তৈরি করতে না পারে।
এআইয়ের স্বায়ত্তশাসন নিয়ে উদ্বেগ সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার স্বায়ত্তশাসন নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিরাপত্তা পরীক্ষার সময় ওপেনএআইয়ের এক হাজারের বেশি এআই এজেন্ট নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করে ইন্টারনেটে সংযোগ স্থাপন এবং একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রবেশের চেষ্টা করেছিল।
এর আগে ওপেনএআইয়ের এআই এজেন্টদের একটি জার্মান প্রোগ্রামিং উইকি সাইট দখল করে নিজেদের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের ঘটনাও আলোচনায় আসে। এসব ঘটনা উন্নত এআই ব্যবস্থা কতটা স্বাধীনভাবে আচরণ করতে পারে, তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
স্যান্ডার্সের যুক্তি, বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর নেতারাই যখন শক্তিশালী এআই ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে স্বীকার করছেন, তখন আরও শক্তিশালী প্রযুক্তি তৈরির আগে এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।
আইন ভাঙলে কঠোর শাস্তির প্রস্তাব প্রস্তাবিত বিলে শুধু নিষেধাজ্ঞার কথা নয়, আইন অমান্যকারীদের জন্য কঠোর শাস্তির ব্যবস্থার কথাও বলা হয়েছে। নিষিদ্ধ ধরনের সুপারইন্টেলিজেন্ট এআই তৈরিতে জড়িত কোনো ব্যক্তির সর্বোচ্চ ২০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিরাপত্তা তদারকির জন্য একটি নতুন কেন্দ্রীয় সরকারি সংস্থা গঠনের প্রস্তাবও রয়েছে। সংস্থাটি এআই নিরাপত্তা নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করবে।
‘মানবতার ভবিষ্যৎ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হাতে নয়’ প্রতিনিধি গ্রেগ কাসারও প্রস্তাবিত বিলটির পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তার মতে, মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি এত দ্রুত এগিয়েছে যে এমন কিছু মডেল তৈরি হচ্ছে, যেগুলোকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে।
স্যান্ডার্স মনে করেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ শুধু বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের হাতে ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। মানবতার ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের মতামতেরও গুরুত্ব থাকা প্রয়োজন।
তবে প্রস্তাবিত বিলটি এখনো আইনে পরিণত হয়নি। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চলমান বিতর্ক আরও জোরালো হয়েছে। বিশেষ করে মানুষের চেয়ে বেশি সক্ষম ও স্বায়ত্তশাসিত এআই তৈরি কতটা নিরাপদ—এই প্রশ্নই এখন নীতিনির্ধারকদের সামনে বড় হয়ে উঠছে।
