‘আমার ছেলের করা ভুলের জন্য আমি ক্ষমা চাই। দয়া করে তাকে ক্ষমা করে আমাদের কাছে ফিরিয়ে দিন।’—অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে এমন আকুতি জানিয়েছেন রসমানিক্কাম যোগালক্ষ্মী। তার ২৪ বছর বয়সী ছেলে আনোজন শিবরাসা সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হয়েছেন বলে জানিয়েছে তার পরিবার।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে করা একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে সৌদি আরবে আনোজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়। অভিযোগটি ইসলাম ও মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে অবমাননার সঙ্গে সম্পর্কিত। শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, আনোজন বর্তমানে সৌদি আরবে বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছেন এবং তার বিষয়টি তারা কূটনৈতিকভাবে অনুসরণ করছে।
যেভাবে মামলার সূত্রপাত পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, শ্রীলঙ্কায় একটি হিন্দু তীর্থযাত্রাকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধর্মীয় বিতর্কের সূত্রপাত হয়। ওই বিতর্কের মধ্যে একজন ব্যক্তি হিন্দু ধর্মের একটি দেবতাকে নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এর জবাবে আনোজন তামিল ভাষায় মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে অবমাননা করে একটি মন্তব্য করেন বলে অভিযোগ ওঠে। পরে তিনি মন্তব্যটি মুছে দিয়ে ক্ষমা চান এবং একটি ভিডিও বার্তাও দেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
তবে ওই মন্তব্যের স্ক্রিনশট ছড়িয়ে পড়ে এবং আনোজন যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন, সেখানে পাঠানো হয়। পরে বিষয়টি সৌদি কর্তৃপক্ষের নজরে আসে। পরিবারের দাবি, এরপর জুলাইয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
শ্রীলঙ্কার সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আনোজনের বিরুদ্ধে প্রথমে আল-আহসা ফৌজদারি আদালত পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং ৩০ লাখ সৌদি রিয়াল জরিমানা করেছিলেন। পরে তার পক্ষ থেকে সাজা কমানোর আবেদন করে আপিল করা হয়।
আপিলের পর মৃত্যুদণ্ড শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিজিথা হেরাথ জানিয়েছেন, আনোজনের পক্ষের আপিলের পর সৌদি প্রসিকিউশন তাকে সাইবার অপরাধ আইনের পরিবর্তে শরিয়াহ আইনের আওতায় বিচারের আবেদন করে। এরপর আপিলের পর্যায়ে তার সাজা মৃত্যুদণ্ডে উন্নীত হয় বলে তিনি জানান।
তবে শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ১৮ সেপ্টেম্বর জানিয়েছিল, তারা সৌদি আদালতের আনুষ্ঠানিক লিখিত রায়ের অপেক্ষায় রয়েছে। মন্ত্রণালয় বলেছে, রিয়াদে থাকা শ্রীলঙ্কার দূতাবাস এবং কলম্বোর সৌদি দূতাবাসের সঙ্গে সমন্বয় করে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।
ক্ষমার আবেদন নিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা আনোজনের পরিবারের সদস্যরা ২১ সেপ্টেম্বর শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট আনুরা কুমারা দিসানায়েকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। প্রেসিডেন্ট তাদের আশ্বস্ত করেন যে সরকার আনোজনের জন্য ক্ষমা পাওয়ার বিষয়ে আইনি ও কূটনৈতিক—দুই পথেই চেষ্টা চালাবে। সৌদি বাদশাহর কাছে ক্ষমার আবেদন জানাতেও কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানানো হয়।
শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও আনোজনকে সম্ভাব্য সব ধরনের সহায়তা দেওয়ার কথা জানিয়েছে। এদিকে দেশটির বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারাও সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে তার সাজা মওকুফের আহ্বান জানিয়েছেন। ২৪ সেপ্টেম্বর কয়েকজন তামিল ও মুসলিম সংসদ সদস্য সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে আনোজনের জন্য রাজকীয় ক্ষমা চেয়ে আবেদন করেন।
শ্রীলঙ্কার সরকার জানিয়েছে, সৌদি আরবে আনোজনের আইনি প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তার মামলায় আইনি সহায়তা ও কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।
পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ নিয়ে উদ্বেগ আনোজনের পরিবারের দাবি, কয়েক দিন ধরে তার সঙ্গে তাদের যোগাযোগ নেই। কারাগারে থাকা মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের সাধারণত ব্যক্তিগত মোবাইল ব্যবহারের সুযোগ সীমিত থাকায় নির্ধারিত ব্যবস্থার মাধ্যমে যোগাযোগ করতে হয়।
এদিকে আনোজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কোনো সময়সূচি প্রকাশ করা হয়নি। ফলে তার সাজা কখন কার্যকর হতে পারে, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
