রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নিয়ে আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে ধরার বিষয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ও ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেন। তাঁর দাবি, আত্মরক্ষার স্বার্থে অল্প সময়ের জন্য তিনি অস্ত্র উঁচিয়ে ধরেছিলেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পুলিশ, স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতাদের যৌথ সিদ্ধান্তে পরিচালিত মাদকবিরোধী সামাজিক প্রতিরোধ কর্মসূচির অংশ হিসেবে তিনি ওই এলাকায় গিয়েছিলেন।
রোববার দুপুরে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক বিবৃতিতে এসব কথা জানান ইশরাক। এর আগে শনিবার বিকেলে গেন্ডারিয়া রেলস্টেশন-সংলগ্ন এলাকায় অভিযানের সময় তাঁর অস্ত্র হাতে থাকার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয় এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়।
মাদক কারবারের অভিযোগ ও নিরাপত্তাঝুঁকির কথা জানালেন ইশরাক
বিবৃতিতে ইশরাক জানান, ঢাকা-৬ আসনের জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই গেন্ডারিয়ার ঘণ্টিঘর, মুন্সিটেক, করাতিটোলা ও আশপাশের এলাকায় মাদক কেনাবেচার অভিযোগ পেয়ে আসছিলেন তিনি। স্থানীয় বাসিন্দারা শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাদকের বিস্তার নিয়েও তাঁর কাছে অভিযোগ করেছেন বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
ইশরাকের দাবি, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর এলাকাটি মাদক কারবারিদের অন্যতম প্রধান ট্রানজিট পয়েন্টে পরিণত হয়। গত জুনে মাদক-সংক্রান্ত সহিংসতায় তিনজন নাগরিক গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তিনি এলাকাটি পরিদর্শন করেন। এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিক সমন্বয় সভাও করেন।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, জনবলসংকট দূর করা এবং মাদকের আস্তানার কাছাকাছি স্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের জন্য সংশ্লিষ্ট থানাকে আধাসরকারি পত্র (ডিও লেটার) দিয়েছিলেন তিনি। বিষয়টি এখনো বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় রয়েছে বলে দাবি করা হয়।
হামলার আশঙ্কায় অস্ত্র উঁচিয়ে ধরার দাবি
ইশরাকের বিবৃতি অনুযায়ী, অভিযানে যাওয়ার আগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নিজস্ব গোয়েন্দা সূত্র থেকে তাঁর নিরাপত্তাঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছিল। মাদক কারবারিরা ভবনের ছাদ থেকে আকস্মিক গুলি চালাতে পারে বলেও আশঙ্কার কথা জানানো হয়।
বিবৃতিতে দাবি করা হয়, কর্মসূচি চলাকালে একটি অস্থায়ী আস্তানার কাছে পৌঁছালে ৩০ থেকে ৩৫ জন ব্যক্তি হইচই করে তাঁদের গাড়িবহরের দিকে মারমুখী ভঙ্গিতে এগিয়ে আসেন। এ পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য হামলা মোকাবিলা এবং জানমালের নিরাপত্তার স্বার্থে তিনি ও তাঁর সরকারি নিরাপত্তারক্ষীরা গাড়ি থেকে নেমে অল্প সময়ের জন্য অস্ত্র উঁচিয়ে ধরেন।
ইশরাকের ভাষ্য, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পরপরই অস্ত্রটি যথাস্থানে রাখা হয়। তিনি আরও দাবি করেন, আগ্নেয়াস্ত্রটি যথাযথ কর্তৃপক্ষের লাইসেন্সপ্রাপ্ত এবং আত্মরক্ষার স্বার্থেই তা প্রদর্শন করা হয়েছিল।
অভিযানে ছয়জন আটক, দাবি প্রতিমন্ত্রীর
বিবৃতিতে বলা হয়, ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পরপরই গেন্ডারিয়া থানা-পুলিশকে অবহিত করা হয়। পরে পুলিশের উপস্থিতি ও সহযোগিতায় সন্দেহভাজন আস্তানাগুলোতে যৌথ অভিযান চালানো হয়।
ইশরাকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অভিযানে চার থেকে পাঁচটি অবৈধ ও অস্থায়ী মাদকের আস্তানা উচ্ছেদ করা হয়েছে। এসব স্থান থেকে হেরোইন বা হেরোইনজাতীয় মাদক, বিদেশি মদ, মাদক সেবনের সরঞ্জাম, দেশীয় ধারালো অস্ত্র, মাদক বিক্রির নগদ অর্থ এবং ছিনতাই করা মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়েছে বলে বিবৃতিতে দাবি করা হয়।
এ ঘটনায় ছয়জনকে আটক করে জব্দ করা আলামতসহ গেন্ডারিয়া থানা-পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী।
গণমাধ্যমের সংবাদ নিয়ে ইশরাকের অভিযোগ
বিবৃতিতে প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার, দৈনিক ইত্তেফাক ও দৈনিক কালবেলাসহ কয়েকটি গণমাধ্যমের সংবাদ পরিবেশন নিয়ে সমালোচনা করেন ইশরাক। তাঁর অভিযোগ, এসব গণমাধ্যম ঘটনার খণ্ডিত দৃশ্য তুলে ধরে অভিযানের প্রেক্ষাপট, পুলিশের ভূমিকা, মাদক ও অস্ত্র উদ্ধারের দাবি এবং ছয়জনকে আটকের বিষয়টি যথাযথভাবে তুলে ধরেনি।
তিনি বলেন, কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও, ফটোকার্ড ও খণ্ডিত শিরোনামের ভিত্তিতে পুরো ঘটনার মূল্যায়ন করা যায় না। এতে তাঁর ভূমিকা ও উদ্দেশ্য নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
গণমাধ্যমকে সংবাদ প্রকাশের আগে তথ্য যাচাই এবং ঘটনার পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট তুলে ধরার আহ্বান জানান প্রতিমন্ত্রী।
মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত রাখার ঘোষণা
বিবৃতিতে মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা পুনর্ব্যক্ত করেন ইশরাক। ঢাকা-৬ আসনকে মাদকমুক্ত করা তাঁর অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার উল্লেখ করে তিনি বলেন, মাদকের আস্তানা উচ্ছেদের উদ্যোগ ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।
তবে অস্ত্র প্রদর্শন, অভিযানের সময়কার পরিস্থিতি এবং জব্দ করা আলামতের বিষয়ে প্রতিমন্ত্রীর বিবৃতিতে দেওয়া তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।
