যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে তা আগের সংঘাতের চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে বলে সতর্ক করেছে ইরান। একই সঙ্গে দেশটির সেনাবাহিনীর মুখপাত্র বলেছেন, সম্ভাব্য যুদ্ধ কখন শেষ হবে এবং কী শর্তে শেষ হবে, তা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্ধারণ করতে পারবেন না।
রোববার (১ নভেম্বর) ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া বক্তব্যে সেনাবাহিনীর মুখপাত্র মোহাম্মদ আকরামিনিয়া এ হুঁশিয়ারি দেন। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে সম্ভাব্য কোনো যুদ্ধ আগের সংঘাতের চেয়েও দীর্ঘ হতে পারে। আর সেই যুদ্ধ কখন বা কী শর্তে শেষ হবে, তা নির্ধারণের ক্ষমতা মার্কিন প্রেসিডেন্টের হাতে থাকবে না।
এর এক দিন আগে ইরানে আবারও হামলা শুরুর পরিকল্পনা নিয়ে ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্যে ফোনালাপ হয়েছে বলে খবর প্রকাশিত হয়।
এ ছাড়া আগামী ৪ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরদিনই নতুন করে সংঘাত শুরু হতে পারে—এমন আশঙ্কায় উপসাগরীয় মিত্রদের প্রস্তুত থাকার সতর্কবার্তা দিয়েছে ওয়াশিংটন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া যুদ্ধ কয়েক মাস ধরে চলে। সংঘাতের তীব্র পর্যায়ে ইরান পুরো অঞ্চলজুড়ে হাজার হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে পাল্টা জবাব দেয়। লেবানন ও ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোও লড়াইয়ে যুক্ত হয়। একপর্যায়ে সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে।
আকরামিনিয়ার বক্তব্যের আগের দিন ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মুজতাবা খামেনির নামে একটি লিখিত বার্তা প্রকাশিত হয়। এতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল নতুন করে হামলা চালালে ইরানের পাল্টা আঘাতের ক্ষেত্রে ভৌগোলিক কোনো সীমা থাকবে না।
একই বক্তব্যের প্রতিধ্বনি করে রোববার ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) মুখপাত্র হোসেইন মোহেব্বি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতের ক্ষেত্রে ভৌগোলিক কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। শত্রুপক্ষের ক্ষয়ক্ষতি নিশ্চিত করতে বিস্তৃত এলাকাকে যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, শনিবার (৩১ অক্টোবর) ট্রাম্প বলেছেন, ইরানে আরও ‘এক বা দুটি’ লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্যে রয়েছে পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন কমপ্লেক্স।
পশ্চিমা গোয়েন্দাদের ধারণা, পারমাণবিক উপাদান সংরক্ষণের কাজে ব্যবহৃত হয়ে থাকতে পারে এই স্থাপনাটি। চলমান যুদ্ধে এখন পর্যন্ত সেখানে হামলা চালায়নি যুক্তরাষ্ট্র।
কাতারের মধ্যস্থতায় আলোচনা চলছে যুদ্ধের হুমকি-পাল্টা হুমকির মধ্যেই সংঘাত বন্ধে কাতারের মধ্যস্থতায় আলোচনায় বসেছেন ইরানের প্রতিনিধিরা। রোববার টানা তৃতীয় দিনের মতো দোহায় কাতারি মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন ইরানি আলোচকেরা। আলোচনার বিষয়ে অবগত এক কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছেন।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, চলমান আলোচনার উদ্দেশ্য কাতারের মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে পরামর্শ অব্যাহত রাখা। একই সঙ্গে কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা—দুই ক্ষেত্রেই প্রস্তুত রয়েছে তেহরান।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে দেওয়া বক্তব্যে আরাঘচি জানান, দুই দিনের একটি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা শনিবার এক সাক্ষাৎকারে আরাঘচির বক্তব্য উদ্ধৃত করে জানায়, ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তি হলে দুই দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার একটি প্রস্তাব তৈরি করেছেন ইরান ও কাতারের আলোচকেরা।
আরাঘচি বলেন, এই প্রক্রিয়ায় তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন। আশা করছেন, অন্য পক্ষও যুক্তিবোধের পরিচয় দেবে এবং অন্য পথের চেয়ে কূটনীতিকে অগ্রাধিকার দেবে।
এদিকে, ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান মোহসেন রেজায়ি শনিবার জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে. ডি. ভ্যান্সের কাছ থেকে একটি চিঠি পেয়েছেন তিনি। রেজায়ির ভাষায়, চিঠিতে যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্যের ‘সুরে’ ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে। তবে এখনো এর জবাব দেননি তিনি।
রেজায়ি আরও বলেন, ইরান আগে থেকেই ওয়াশিংটনকে জানিয়েছে, তাদের শর্ত পূরণ না হলে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে না এবং কোনো আলোচনাও হবে না। তেহরানের শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে বিদেশে জব্দ করা ইরানের সম্পদ অবমুক্ত করা, দেশটির বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক মাস ধরে চলা নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার, দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া এবং সব রণাঙ্গনে যুদ্ধ বন্ধ করা।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দাবি করে আসছে ইরান। দেশটির অনুমতি ছাড়া প্রণালি অতিক্রমের চেষ্টা করা জাহাজগুলোকে বারবার লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। এর জবাবে ইরানের বন্দরগুলোতে পাল্টা নৌ-অবরোধ আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
