বোম্বার্ডিয়ারকে যুক্তরাষ্ট্রে বিমান বানানোর শর্ত দিলেন ট্রাম্প

বোম্বার্ডিয়ারকে যুক্তরাষ্ট্রে বিমান বানানোর শর্ত দিলেন ট্রাম্প

আন্তর্জাতিক

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বিমান বিক্রি অব্যাহত রাখতে হলে দেশটির মাটিতেই উড়োজাহাজ তৈরি করতে হবে কানাডার বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোম্বার্ডিয়ারকে। অন্যথায় মার্কিন বাজারে প্রতিষ্ঠানটির বিমান বিক্রি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, বোম্বার্ডিয়ারের বিমান আর যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বিক্রি করতে দেওয়া হবে না। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, প্রতিষ্ঠানটির তৈরি বিমানের মান যথেষ্ট ভালো নয়।

ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশাধিকার ধরে রাখতে হলে বোম্বার্ডিয়ারকে দেশটির ভেতরেই উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রকে অর্থের ভাণ্ডার হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা বন্ধ করার আহ্বান জানান তিনি।

যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে চলমান বাণিজ্য উত্তেজনার মধ্যেই ট্রাম্পের এই হুমকি সামনে এলো। বিভিন্ন দেশের পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপের মাধ্যমে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর যে নীতি তার প্রশাসন নিয়েছে, বোম্বার্ডিয়ারকে দেওয়া নতুন শর্তকেও তারই অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এরই মধ্যে মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপের প্রস্তুতি নিচ্ছে কানাডা। ফলে দুই দেশের দীর্ঘদিনের বাণিজ্য বিরোধ আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

তবে ট্রাম্পের ঘোষণাটি কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানায়নি হোয়াইট হাউস। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন পাওয়া বোম্বার্ডিয়ারের বিমানগুলোর সরবরাহ কীভাবে বন্ধ করা হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

এ ছাড়া বোম্বার্ডিয়ারের বিমান যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডা বাণিজ্য চুক্তির আওতাভুক্ত। চুক্তিটি বাস্তবায়নে ট্রাম্প নিজেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।

মার্কিন বিমান ও মহাকাশ খাতের বিশ্লেষক রিচার্ড আবুলাফিয়ার মতে, ট্রাম্পের ঘোষণার কারণে বোম্বার্ডিয়ারের ব্যবসায়িক জেটের ক্রেতারা ব্যাপকভাবে অর্ডার বাতিল করবেন—এমন আশঙ্কা খুব বেশি নেই। একই সঙ্গে এসব বিমান বিক্রি বন্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের হাতে বাস্তবিক কতটা কার্যকর ব্যবস্থা রয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

আবুলাফিয়া জানান, বোম্বার্ডিয়ারের বেশিরভাগ ব্যবসায়িক জেটে ব্যবহৃত ইঞ্জিন যুক্তরাষ্ট্রেই তৈরি হয়। এসব ইঞ্জিন সরবরাহ করে হানিওয়েল অ্যারোস্পেস ও জিই অ্যারোস্পেস।

যুক্তরাষ্ট্রে বোম্বার্ডিয়ারের উপস্থিতিও বেশ শক্তিশালী। কানাডার মন্ট্রিয়লভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটির দেশটিতে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কর্মী এবং প্রায় ২ হাজার ৮০০ সরবরাহকারী রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিষ্ঠানটির কারখানা ও সেবা কেন্দ্রও রয়েছে। পাশাপাশি দেশটিতে তাদের ষষ্ঠ সেবা কেন্দ্র চালুর কাজ চলছে।

বোম্বার্ডিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক জেট ‘গ্লোবাল ৮০০০’-এর ডানাও যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে তৈরি করা হয়। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, প্রতি বছর তারা মার্কিন সরবরাহকারীদের পেছনে ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় করে। যুক্তরাষ্ট্রে কর্মী, গ্রাহক এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর বিনিয়োগও অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।

বোম্বার্ডিয়ারের প্রতিরক্ষা বিভাগও রয়েছে। কানসাসে প্রতিষ্ঠানটির একটি কারখানায় কানাডায় তৈরি বিমানকে বিশেষ সামরিক ও অন্যান্য মিশনের উপযোগী করে প্রস্তুত করা হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের উড়োজাহাজ ও মহাকাশ শিল্পের সঙ্গে কানাডার সরবরাহব্যবস্থা অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। ফলে কানাডায় তৈরি উড়োজাহাজের ওপর বড় ধরনের বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ আরোপ করা হলে এর প্রভাব মার্কিন প্রতিষ্ঠান ও সরবরাহকারীদের ওপরও পড়তে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ ও প্রতিরক্ষা শিল্পের বাণিজ্য সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশটির এই খাতের রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় ২৫ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে খাতটিতে ১০৯ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ছিল।

এদিকে ট্রাম্পের শুল্কনীতিতে এখন পর্যন্ত উড়োজাহাজ ও মহাকাশ খাত তুলনামূলকভাবে কম প্রভাবিত হয়েছে। উড়োজাহাজ ও যন্ত্রাংশের স্বাভাবিক সরবরাহও বড় ধরনের শুল্কের আওতায় পড়েনি।

বোম্বার্ডিয়ারের গ্রাহকদের পরিচালিত প্রায় ৫ হাজার ১০০টি উড়োজাহাজের অর্ধেকের কাছাকাছি যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটির জন্য মার্কিন বাজারের গুরুত্ব কতটা, তা সহজেই অনুমান করা যায়।

বোম্বার্ডিয়ারকে নিয়ে ট্রাম্পের কঠোর অবস্থান অবশ্য নতুন নয়। চলতি বছরের জানুয়ারিতেও তিনি প্রতিষ্ঠানটির গ্লোবাল এক্সপ্রেস ব্যবসায়িক জেটের সনদ বাতিল এবং কানাডায় তৈরি সব উড়োজাহাজের ওপর ৫০ শতাংশ আমদানি শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত ওই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়নি।

অন্যদিকে, বোম্বার্ডিয়ারের ব্যবসায় সাম্প্রতিক সময়ে প্রবৃদ্ধিও দেখা গেছে। জুলাইয়ে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে তাদের আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬ শতাংশ বেড়ে ২ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। বিমান বিক্রির পাশাপাশি বিমান-পরবর্তী সেবার চাহিদা বৃদ্ধিও এই প্রবৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রেখেছে।

সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্র-কানাডার বাণিজ্য বিরোধের মধ্যে ট্রাম্পের সর্বশেষ হুমকি কতটা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে এবং তা বোম্বার্ডিয়ারের মার্কিন ব্যবসায় কী ধরনের প্রভাব ফেলবে, এখন সেটিই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।