মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। সৌদি আরবে হুতিদের নতুন হামলা এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের হামলার খবরের মধ্যে সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ২ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
সোমবার ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ২ দশমিক ৯০ ডলার বা ২ দশমিক ৭৭ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৭ দশমিক ৫১ ডলারে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের দাম ২ দশমিক ২৭ ডলার বা ২ দশমিক ২৭ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০২ দশমিক ৩২ ডলারে পৌঁছেছে। বাজার খোলার পর একপর্যায়ে উভয় ধরনের তেলের দামই ৩ শতাংশের বেশি বেড়ে যায়।
এর আগে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে সংকট তৈরির আশঙ্কা দেখা দেয়। এই পাইপলাইনটি হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে সৌদি আরবকে তেল রপ্তানির বিকল্প পথ ব্যবহার করার সুযোগ দেয়।
পাইপলাইনটি বন্ধ থাকায় বৈশ্বিক তেল সরবরাহের প্রায় ৪ শতাংশ পর্যন্ত ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক উত্তেজনার সঙ্গে তেলের সরবরাহ নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় জাজান প্রদেশে হুতিদের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকটি বাড়ি ও একটি মসজিদের ভিডিও প্রকাশ করা হয়। হুতিরাও জানিয়েছে, তারা সৌদি আরবের পার্শ্ববর্তী একটি প্রদেশে দেশটির সামরিক বাহিনীর একটি ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে।
একই দিন হরমুজ প্রণালিতে একটি জাহাজে ছোড়া একটি প্রজেক্টাইল আঘাত হানলে জাহাজটিতে আগুন ধরে যায়। পরে জাহাজটির ক্রুদের সরিয়ে নেওয়া হয় বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ মেরিটাইম সিকিউরিটি এজেন্সি।
এদিকে ইরান জানিয়েছে, দেশটির উপকূলের কাছে একটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনায় একজন নিহত এবং চারজন ক্রু আহত হয়েছেন।
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল রপ্তানিকারক সৌদি আরবকে ঘিরে সরবরাহ ঝুঁকি বাড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধির আশঙ্কা আগে থেকেই ছিল। এর সঙ্গে ইয়েমেনের ইরানপন্থি হুতিদের তৎপরতা নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
শুক্রবার হুতিরা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পেরিম দ্বীপে পৌঁছেছে বলে জানা গেছে। এর মাধ্যমে বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ বাব এল-মান্দেব প্রণালিতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করার চেষ্টা করছে তারা। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ৪ থেকে ৫ শতাংশ এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হয়েছে।
হুতিদের হামলার প্রভাবে গত সপ্তাহে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রায় ৮ শতাংশ বেড়েছিল। এর ফলে জুলাইয়ের পর প্রথমবারের মতো অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যায়।
আইজি মার্কেটের বিশ্লেষক টনি সাইকামোরের মতে, তেলের বাজারের পরবর্তী পরিস্থিতি অনেকটাই নির্ভর করবে ওমানে চলতি সপ্তাহের আলোচনায় বাস্তবসম্মত কোনো সমাধান আসে কি না এবং সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন কত দ্রুত চালু করা সম্ভব হয় তার ওপর। এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি না হলে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে।
তিনি আশঙ্কা করেছেন, পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে অপরিশোধিত তেলের দাম মার্চের শুরুতে ওঠা ১১৯ দশমিক ৪৮ ডলারের উচ্চতাকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
তবে রোববার ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, হরমুজ প্রণালি নিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলো ও ইরানের মধ্যে সোমবার ওমানে যে বৈঠক হওয়ার কথা ছিল, তা স্থগিত করা হয়েছে।
ফলে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত, গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং সৌদি আরবের তেল পরিবহনব্যবস্থায় বিঘ্ন—সব মিলিয়ে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ আরও গভীর হয়েছে। পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে তেলের দামে আরও বড় ধরনের ওঠানামার আশঙ্কা করছেন বাজার বিশ্লেষকেরা।
