বাইন্যান্সে ক্রিপ্টো চুরি'র অভিযোগ অস্বী'কার উত্তর কোরিয়ার

বাইন্যান্সে ক্রিপ্টো চুরি’র অভিযোগ অস্বী’কার উত্তর কোরিয়ার

আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিপ্টোকারেন্সি বিনিময় প্ল্যাটফর্ম বাইন্যান্স থেকে ৬৩০ কোটি ডলারের বেশি মূল্যের ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরির ঘটনায় উত্তর কোরিয়ার জড়িত থাকার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে দেশটি। যুক্তরাষ্ট্রের এ অভিযোগকে ‘উদ্ভট বক্তব্য’ ও ‘গুরুতর রাজনৈতিক উসকানি’ বলে অভিহিত করেছে পিয়ংইয়ং।

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম কেসিএনএ প্রকাশিত এক বিবৃতিতে দেশটির ক্ষমতাসীন দলের কর্মকর্তা ও নেতা কিম জং উনের বোন কিম ইয়ো জং এ মন্তব্য করেন।

এর আগে, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআই অভিযোগ করে, বাইন্যান্সে সাইবার হামলার পেছনে উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত হ্যাকার গোষ্ঠী ‘ট্রেডারট্রেইটর’ জড়িত। সংস্থাটির দাবি, এ হামলায় ৬০০ কোটি ডলারের বেশি মূল্যের ভার্চ্যুয়াল সম্পদ চুরি হয়েছে।

ঘটনাটিকে ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম আর্থিক চুরির ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। কিম ইয়ো জং বলেন, এফবিআই উত্তর কোরিয়াকে ‘সাইবার অপরাধী রাষ্ট্র’ হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করছে। দেশটির পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত একটি হ্যাকিং সংগঠন এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত বলে যুক্তরাষ্ট্র যে দাবি করেছে, তা ভিত্তিহীন।

তিনি আরও বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত সাইবার অপরাধের দায় উত্তর কোরিয়ার ওপর চাপানোর চেষ্টা করছে ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্রের এ ধরনের বক্তব্য নতুন নয়, বরং এটি উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে গুরুতর রাজনৈতিক উসকানি।

 ক্রিপ্টো চুরি থেকে অস্ত্র কর্মসূচিতে অর্থায়নের অভিযোগ

সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরির ক্ষেত্রে উত্তর কোরিয়ার হ্যাকাররা বিশ্বের অন্যতম সক্রিয় গোষ্ঠী। এসব চুরির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচিতে ব্যবহার করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে ক্রিপ্টো চুরি ও অন্যান্য সাইবার অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছে পিয়ংইয়ং।

ব্লকচেইন বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান এলিপটিকের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছর উত্তর কোরিয়া প্রায় ৭৬০ কোটি ডলারের ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরি করেছে, যা আগের যেকোনো বছরের তুলনায় বেশি।

দক্ষিণ কোরিয়ার বিশ্লেষকদের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগের পর উত্তর কোরিয়ার দ্রুত প্রতিক্রিয়ার পেছনে দেশটির অর্থের উৎস বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা কাজ করতে পারে। নিষেধাজ্ঞার কারণে ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরি দেশটির অর্থ সংগ্রহের অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।

কিউংনাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর ফার ইস্টার্ন স্টাডিজের অধ্যাপক লিম ইউল-চুল বলেন, নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরি উত্তর কোরিয়ার শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা এবং অস্ত্র উন্নয়নের অর্থ সংগ্রহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে।

তিনি মনে করেন, ক্রিপ্টো ওয়ালেট, অর্থ পাচারকারী নেটওয়ার্ক ও বিনিময় প্ল্যাটফর্মের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন পদক্ষেপ দেশটির আয়ের গুরুত্বপূর্ণ একটি উৎস বন্ধ করে দিতে পারে।

দক্ষিণ কোরিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে উত্তর কোরিয়ার মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ছিল ৩ হাজার ৫০৯ কোটি ডলার। সে হিসাবে বাইন্যান্স থেকে চুরি হওয়া অর্থের পরিমাণ দেশটির বার্ষিক অর্থনৈতিক উৎপাদনের প্রায় ছয় ভাগের এক ভাগের সমান।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়েও বার্তা

ক্রিপ্টো চুরির অভিযোগের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়েও বক্তব্য দিয়েছেন কিম ইয়ো জং। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ‘অত্যন্ত অপ্রীতিকর শত্রুতাপূর্ণ মনোভাবের’ কারণে কিছু বিষয় নতুন করে বিবেচনা করবে উত্তর কোরিয়া। তবে কোন বিষয়গুলো পুনর্বিবেচনা করা হবে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানাননি তিনি।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে আবারও শীর্ষ বৈঠক ও কূটনৈতিক আলোচনা শুরুর আগ্রহ প্রকাশ করলেও এ বিষয়ে এখনো প্রকাশ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি পিয়ংইয়ং।

সিউলে অবস্থিত কোরিয়া ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল ইউনিফিকেশনের জ্যেষ্ঠ গবেষক হং মিনের মতে, উত্তর কোরিয়ার বক্তব্যের মূল বার্তা শুধু সাইবার চুরির অভিযোগ নিয়ে নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেশটির সম্পর্ক নিয়েও। তিনি বলেন, আলোচনার পথ খোলা রাখতে চাইলে এই অভিযোগকে চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না করার বার্তা দিচ্ছে পিয়ংইয়ং।

এদিকে, এফবিআই জানিয়েছে, চুরি হওয়া ক্রিপ্টোকারেন্সির একটি অংশ ইথেরিয়ামে রূপান্তর করা হয়েছে। সেগুলো আরও অর্থ পাচারের মাধ্যমে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে সংস্থাটি।

বাইন্যান্স জানিয়েছে, চুরি হওয়া সম্পদের প্রায় ৯০ শতাংশ প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব অর্থ ব্যবহার করে পুনরায় পূরণ করা হয়েছে।