আপসের কথা বলে ডেকে নিয়ে অটোরিকশা থামিয়ে কাউছারকে কো’প

আইন-আদালত দেশ জুড়ে বাংলাদেশ

কুমিল্লা নগরের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের যুবদল কর্মী আবু কাউছার (৪৩) হত্যার ঘটনায় জমি নিয়ে বিরোধের জেরে আপস-মীমাংসার কথা বলে তাঁকে ডেকে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। পরে নির্ধারিত স্থানে পৌঁছালে তাঁর অটোরিকশার গতিরোধ করে ধারালো অস্ত্র দিয়ে হামলা চালানো হয় বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। কাউছারকে বাঁচাতে গিয়ে আহত হন অটোরিকশাচালক মাসুমও।

কাউছারের বড় ভাই কবির হোসেনের করা মামলার এজাহারে হামলার বিস্তারিত বিবরণ উঠে এসেছে। এতে তৌহিদুল ইসলাম ওরফে তৌহিদ, তাঁর বড় ভাই তানজির আলম, তাঁদের বাবা খোরশেদ আলমসহ পাঁচজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি অজ্ঞাতপরিচয় আরও তিন থেকে চারজনকে আসামি করা হয়েছে।

গত শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার ছত্রখিল এলাকায় পুলিশ ফাঁড়ির পূর্ব পাশে সড়কে এ হামলার ঘটনা ঘটে। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুপুরে কাউছারের মৃত্যু হয়। রোববার দুপুরে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় মামলাটি নথিভুক্ত হয়।

জমি নিয়ে বিরোধ, আপসের প্রস্তাব

মামলার এজাহার অনুযায়ী, কাউছার কাপ্তান বাজার এলাকায় তাঁর বন্ধু শামীম হোসেন, হেলাল উদ্দিন ও গোলাম রসুলের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করতেন। কয়েক দিন আগে শামীম গোমতী নদীর উত্তর পাড়ের চরে ৮ থেকে ১০ কানি জমি ইজারা নিয়ে সেখানে নেপিয়ার ঘাস চাষ শুরু করেন।

বাদীর অভিযোগ, ওই জমির সামনে আসামিরা জোর করে একটি কফি হাউস নির্মাণের উদ্যোগ নেন। কাউছারসহ অন্যরা এতে আপত্তি জানালে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। পরে আপস-মীমাংসার কথা বলে ১৬ অক্টোবর সকাল সাড়ে ১০টার দিকে তাঁদের ছত্রখিল পুলিশ ফাঁড়ির পূর্ব পাশে আসতে বলা হয়।

এজাহারে বলা হয়েছে, নির্ধারিত সময়ে কাউছার, শামীম, আমির হোসেন, রবিন ও ডালিম একটি অটোরিকশায় ঘটনাস্থলে যান। অন্য একটি অটোরিকশায় ছিলেন হেলাল উদ্দিন, আরমান, আবদুল বারেক ও ইসমাইল। তাঁরা পৌঁছানোর পর কাউছারকে বহনকারী অটোরিকশার গতিরোধ করেন আসামিরা।

ধারালো অস্ত্র দিয়ে হামলার অভিযোগ

এজাহারের বিবরণ অনুযায়ী, সাইফুল ইসলাম ওরফে সুমন চাপাতি দিয়ে কাউছারের পিঠের ডান পাশে কোপ দেন। ফরহাদ হোসেন সুইচ গিয়ার ছুরি দিয়ে তাঁর বুকের ডান পাশে আঘাত করতে গেলে কাউছার হাত দিয়ে তা ঠেকানোর চেষ্টা করেন।

এ সময় কাউছারকে রক্ষা করতে এগিয়ে যান অটোরিকশাচালক মাসুম। অভিযোগ অনুযায়ী, তানজির আলম তাঁর মাথা লক্ষ্য করে রামদা দিয়ে কোপ দেন। এতে মাসুমের পিঠেও গুরুতর জখম হয়।

ঘটনাস্থলে থাকা ব্যক্তিরা চিৎকার শুরু করলে স্থানীয় লোকজন এগিয়ে আসেন। তখন আসামিরা আগে থেকে রাখা দুটি মোটরসাইকেলে করে পালিয়ে যান বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

 পূর্বপরিকল্পিত হামলার তথ্য পেয়েছে পুলিশ

কাউছার হত্যার ঘটনায় গত শনিবার সন্ধ্যায় সংবাদ সম্মেলন করে কুমিল্লা জেলা পুলিশ ও স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)-১১। সেখানে পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান বলেন, প্রাথমিক তদন্তে হত্যাকাণ্ডের পেছনে পূর্বপরিকল্পনার তথ্য পাওয়া গেছে।

পুলিশ সুপারের ভাষ্য অনুযায়ী, কাউছার ও তাঁর সঙ্গীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর তৌহিদ, তানজির এবং তাঁদের সঙ্গে থাকা অন্যরা অতর্কিত হামলা চালান। তৌহিদ ধারালো অস্ত্র দিয়ে কাউছারকে গুরুতর জখম করেন। অন্যরাও তাঁকে মারধর করেন।

পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের পর অভিযান চালিয়ে প্রধান অভিযুক্ত তৌহিদ ও তাঁর ভাই তানজিরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঘটনায় অন্য কেউ জড়িত থাকলে তাঁদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।

জমির মালিকানা নিয়ে এজাহার ও পুলিশের বক্তব্যে পার্থক্য

কাউছার হত্যার পেছনে জমি নিয়ে বিরোধের কথা বলা হলেও জমির মালিকানা ও ইজারা সম্পর্কে মামলার এজাহার এবং পুলিশের বক্তব্যে পার্থক্য রয়েছে।

এজাহারে বলা হয়েছে, কাউছারের ব্যবসায়িক সহযোগী শামীম আইনজীবী মিজানের কাছ থেকে গোমতী নদীর উত্তর পাড়ের চরের ৮ থেকে ১০ কানি জমি নেপিয়ার ঘাস চাষের জন্য ইজারা নিয়েছিলেন। ওই জমির সামনে কফি হাউস নির্মাণের উদ্যোগকে কেন্দ্র করে বিরোধের সৃষ্টি হয় বলে বাদীর অভিযোগ।

অন্যদিকে, পুলিশ সুপার সংবাদ সম্মেলনে জানান, বিরোধের সূত্রপাত হওয়া জায়গাটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) মালিকানাধীন বলে প্রাথমিকভাবে তথ্য পাওয়া গেছে।

কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার বলেন, পুলিশ ও এসআরবি হত্যাকাণ্ডের মূল অভিযুক্ত তৌহিদসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে। পুরো বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হবে।

দুই আসামি সাত দিনের রিমান্ডে

কাউছার হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার তৌহিদুল ইসলাম ও তাঁর বড় ভাই তানজির আলমকে সাত দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দিয়েছেন আদালত।

রোববার সন্ধ্যায় তাঁদের আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করে পুলিশ। শুনানি শেষে কুমিল্লার অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ফারহাদ রায়হান ভূঁইয়া সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

এর আগে শনিবার সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার জানান, তৌহিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলাসহ মোট সাতটি মামলা রয়েছে। এসব মামলায় তিনি জামিনে ছিলেন। তানজিরের বিরুদ্ধে একটি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁর বিরুদ্ধে আরও মামলা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।