ষষ্ঠ বিশ্বকাপের পথে মেসি, দুই দশকের বিবর্তনে ফুটবল ইতিহাসের অনন্য অধ্যায়

ষষ্ঠ বিশ্বকাপের পথে মেসি, দুই দশকের বিবর্তনে ফুটবল ইতিহাসের অনন্য অধ্যায়

খেলাধুলা

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের আগে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে লিওনেল মেসি। আর্জেন্টিনা যদি ১৯৬২ সালের পর প্রথম দল হিসেবে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জিততে পারে, তবে সেই ইতিহাসের অন্যতম প্রধান নায়ক হবেন ৩৮ বছর বয়সী এই ফুটবল জাদুকর।

আসন্ন বিশ্বকাপ হবে মেসির ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ। এর মাধ্যমে তিনি বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ অংশগ্রহণের রেকর্ডে স্পর্শ করবেন। দীর্ঘ দুই দশকের ক্যারিয়ারে মেসির সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু প্রতিভা নয়, বরং সময়ের সঙ্গে নিজেকে বদলে নেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা।

২০০৩ সালে বার্সেলোনার জার্সিতে অভিষেকের সময় মেসি ছিলেন গতিময় এক তরুণ উইঙ্গার। ডান প্রান্ত থেকে ড্রিবল করে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগে আতঙ্ক ছড়ানোই ছিল তার প্রধান কাজ। খুব অল্প সময়েই তার অসাধারণ প্রতিভা নজর কাড়ে ফুটবল বিশ্বের।

২০০৮ সালে বার্সেলোনার কোচ হিসেবে পেপ গার্দিওলার আগমন মেসির ক্যারিয়ারে নতুন মোড় এনে দেয়। উইং থেকে তাকে ধীরে ধীরে মাঝমাঠের কাছাকাছি এনে ‘ফলস নাইন’ ভূমিকায় খেলানো শুরু হয়। ২০০৯ সালে রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে ঐতিহাসিক ৬-২ গোলের জয়ে ফুটবল বিশ্ব নতুন এক মেসিকে দেখতে পায়। তিনি শুধু গোলদাতা নন, পুরো দলের আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন।

এরপর কয়েক বছর ইউরোপীয় ফুটবলে প্রায় অপ্রতিরোধ্য ছিলেন মেসি। ২০১১ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে লা লিগায় ৬৯ ম্যাচে ৯৬ গোল করে গড়েন অবিশ্বাস্য রেকর্ড।

তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বার্সেলোনার দলগত কাঠামো বদলে যায়। জাভি ও আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার বিদায়ের পর মেসিকে আরও বড় দায়িত্ব নিতে হয়। তিনি নিজেকে আবারও নতুনভাবে গড়ে তোলেন। গোল করার পাশাপাশি দলের প্রধান প্লেমেকার হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে শুরু করেন।

আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের জার্সিতে মেসির পথচলা ছিল আরও নাটকীয়। ২০১৪ বিশ্বকাপ, ২০১৫ ও ২০১৬ কোপা আমেরিকার ফাইনালে হার তাকে গভীর হতাশায় ফেলে দেয়। এক পর্যায়ে জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণাও দেন। তবে পরে ফিরে এসে নিজেকে নতুন নেতৃত্বগুণে উজ্জ্বল করেন।

২০২১ সালে কোপা আমেরিকা জয়ের মাধ্যমে দীর্ঘ শিরোপা খরা কাটে আর্জেন্টিনার। সেই সাফল্যের ধারাবাহিকতায় ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে দেশকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করেন মেসি। পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে তার নেতৃত্ব, অভিজ্ঞতা ও ম্যাচ নিয়ন্ত্রণের দক্ষতা ছিল অসাধারণ।

বর্তমানে ইন্টার মায়ামির হয়ে খেললেও আগের মতো নিয়মিত দৌড়াতে দেখা যায় না মেসিকে। তবে ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, এটিই তার পরিণত ফুটবল বুদ্ধিমত্তার প্রতিফলন। তিনি খেলার গতি ও পরিস্থিতি আগেভাগেই বুঝতে পারেন এবং সঠিক মুহূর্তে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে তুলে নেন।

দুই দশকের বেশি সময়ের ক্যারিয়ারে মেসির গল্প শুধু গোল, ট্রফি কিংবা রেকর্ডের নয়। এটি একজন ফুটবলারের ধারাবাহিক আত্মবিকাশ, মানিয়ে নেওয়া এবং বারবার নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কারের গল্প। উইঙ্গার, ফলস নাইন, প্লেমেকার, অধিনায়ক—প্রতিটি ভূমিকাতেই তিনি রেখে গেছেন অনন্য ছাপ। আর সেই কারণেই ফুটবল ইতিহাসে লিওনেল মেসি শুধু একজন মহান খেলোয়াড় নন, তিনি এক চলমান কিংবদন্তি।